ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার ৩ দিন পার হয়েছে। নানা ধরনের লিফলেট এবং হ্যান্ডবিল নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে লিফলেট তৈরিতে সৃজনশীল অনেক পন্থা অবলম্বন করছেন প্রার্থীরা।
অনেক প্রার্থী লিফলেটে কিউআর কোড ব্যবহার করছেন। সেই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই প্রার্থীর ইশতেহার দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রার্থীর লিফলেটে স্থান পাচ্ছে তাদের শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মকাণ্ড এবং যোগ্যতার বিবরণ। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে টাকার আদলে তৈরি লিফলেট।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে টাকার আদলে তৈরি কয়েকটি লিফলেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলের মধ্যেই সেই লিফলেট নিয়ে প্রচারণা করতে দেখা যায় আরাফাত হোসেন নামে কেন্দ্রীয় সংসদে কার্যনির্বাহী সদস্য পদের এক প্রার্থীকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ২০১৯-২০ সেশনের এই শিক্ষার্থী অভিনব প্রচার কৌশল সম্পর্কে বলেন, এবারের ডাকসুতে প্রায় দেড় হাজারের মতো প্রার্থী। সবাই নিজের মতো করে লিফলেট বানাচ্ছেন। অনেক ভোটারই প্রার্থীদের কাছ থেকে লিফলেট নিচ্ছেন। অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম তারা লিফলেটের নম্বর মনে রাখতে পারছেন না। আমি প্রথম ২ দিন কোনো লিফলেট না করে অভিনব কিছু করার কথা ভেবেছি। এরপরই এই আইডিয়া নিয়ে এসেছি।
‘নোটটা আসলে একটু আলাদা। এটাকে অনেকেই ইন্টারেস্টিং হিসেবে গ্রহণ করছেন। এটাকে একটা সুভেনির বা ডাকসুর স্মৃতি হিসেবে রেখে দিচ্ছেন। আমার কাছে অনেকে চেয়েও নিচ্ছেন এই নোট। অনেকে এটাকে রুমে বা মানিব্যাগে সংগ্রহ করে রাখছেন। বেশি রভাগ শিক্ষার্থীই ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন।’
একই কৌশলে প্রচারণা করছেন স্যার এফ রহমান হল সংসদের ভিপি প্রার্থী নাঈমুর রহমানও। তবে বাংলাদেশি টাকা নয়, নাঈমুরের লিফলেট মার্কিন এক ডলারের নোটের আদলে বানানো। আসল নোটের মাঝখানে যেখানে জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি সেখানে নিজের ছবি বসিয়েছেন নাইমুর। নোটে দ্য ইউনাইটেড স্টেটস আমেরিকা লেখার বদলে ছাপানো হয়েছে স্যার এ এফ রহমান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন লিখে। মার্কিন নোটের বিভিন্ন সিলমোহর এবং নম্বর তুলে ফেলা হয়েছে। এছাড়া নোটের এক কোণে বসানো হয়েছে নাঈমুরের ব্যালট নম্বর। নোটের ওপর প্রার্থীর জন্য ভোট চেয়েও একটি বার্তা রাখা হয়েছে।
মুদ্রার নোটের আদলে তৈরি লিফলেট বানিয়েছেন আরও অনেকেই। তাদের মধ্যে আছেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক মো. আরমান হোসেন, কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য পদপ্রার্থী সাদেকুর রহমান সানি এবং একই পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবু ছালে মো. হুমায়ুন হেলাল এবং ওয়ালিইউল ইয়ামিন নাবিল। ধারণা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দিনে এই ধরনের প্রচারণায় যোগ দিতে পারেন আরও অনেক প্রার্থী।
প্রার্থীদের এমন অভিনব প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া৷ অনেকে এটিকে দেখেছেন অভিনব এক প্রচারণার উপায় হিসেবে। কারও কারও কাছে এটি নিছকই মজা। আর কেউ কেউ এটিকে ডাকসুর স্মৃতি ধরে রাখার দারুণ একটি উপায় হিসেবে দেখছেন। সংখ্যায় খুব অল্প হলেও কেউ কেউ আবার নেতিবাচকভাবেও নিয়েছেন।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
২০২১-২২ সেশনের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ সাকিব এই প্রচারণা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রার্থীদের বোরিং লিফলেট পেয়ে পেয়ে বিরক্ত। এই নোটের লিফলেটগুলো বেশ ভালো হয়েছে। ডাকসুর স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়া যাবে। দেখতেও খুব ভালো লাগছে আর সাইজেও ছোট।
২০১৮-১৯ সেশনের আরেক শিক্ষার্থী অবশ্য কিছুটা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন। তার মতে, প্রতীকী হলেও টাকার বিষয়টা আনাই ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মনের মধ্যে ঢুকে গেছে টাকা দিয়ে ভোট কেনার বিষয়টি। এটা তো কোনো ভালো প্র্যাকটিস হতে পারে না। ডাকসু নির্বাচনে টাকা দেয়া নিষিদ্ধ। তাই প্রার্থীরা এমন পন্থা বেছে নিচ্ছে। বুঝতে পারছেন কী বার্তা বহন করে এটা?
অভিনব প্রচারণার পেছনে মনস্তাত্বিক কারণ
টাকার আদলে লিফলেট বানিয়ে প্রচারণার পেছনে প্রার্থীদের মনস্তাত্বিক কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসাম্মত মালেকা পারভীন বলেন, ‘আমাদের সবারই টাকার প্রতি আকর্ষণ আছে৷ আমাদের ব্রেনে অলরেডি একটা সেটআপ আছে যে এটা একটা মূল্যবান জিনিস। টাকা দেখলে আমাদের ব্রেন সিগন্যাল দেয়...টাকা দিয়ে সব কেনা যায়৷ ওই বিষয়টা আমলে নিয়েই প্রার্থীরা এভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে আর শিক্ষার্থীরাও এই দিক বিবেচনা করে এটা গ্রহণ করছেন।’
‘টাকার সঙ্গে ভোটের একটা সম্পর্ক আছে। যে কোনো নির্বাচনের কথা বলেন, যেমন চেয়ারম্যান বা এমপি নির্বাচন... প্রার্থীরা টাকা দিয়ে ভোটারদের আকর্ষণ করেন। এখানে শিক্ষার্থীরা তো আর টাকা দিয়ে ভোট কিনবেন না। এটা একটা প্রতীকী বিষয়। কেউ কেউ এটাকে অভিনব ভেবে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন। আবার কেউ নেতিবাচকভাবেও দেখতে পারেন, এভাবে যে আমি টাকার কাছে বিক্রি হব না৷ প্রতীকী বিষয় হলেও কেউ কেউ এটা নিতে অনাগ্রহী হতে পারেন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন। পার্সেপশনের ওপর পুরোটা নির্ভর করছে। কে কিভাবে দেখছেন এটাকে’, যোগ করেন তিনি।
বৈধ নাকি অবৈধ
ডাকসু নির্বাচনের আচরণবিধি ৯ (ক) অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ছাত্র সংগঠন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্বাচনকে লক্ষ্য করে বা কেন্দ্র করে বছর ব্যাপী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো শিক্ষার্থী বা সংগঠন বা কোনো প্রতিষ্ঠানে চাঁদা, অনুদান ও আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন না। ৯ (গ) অনুযায়ী, ভোটারদের কোনো রকম উপঢৌকন বা বকশিস দিতে পারবেন না। তবে যেহেতু এটা প্রতীকী টাকা, তাই এক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ থাকছে না। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীও সময় সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন সেটি।
তিনি বলেন, ‘এই প্রচারণায় নেতিবাচক কিছু দেখছি না। প্রচারণায় অনেকেই নতুন নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু এটা টাকার আদলে তৈরি লিফলেট, আসল টাকা নয়, সেক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে না।’
আমার বার্তা/এল/এমই