
কয়েকদিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বন্যা পরিস্থিতি। দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৩ হাজার ৪৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বান্দরবানে ২৬৮ মিলিমিটার। চট্টগ্রাম নগরের বেশিরভাগ সড়কে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওপর দিয়ে কোমর সমান পানি বইছে। সড়কে সড়কে আটকা পড়েছে যাত্রীবাহী বাস। খাগড়াছড়ি-সাজেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যটকসহ সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
তবে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী তলব করা হয়েছে। আর কক্সবাজারের পানিবন্দি দুর্গত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে নৌবাহিনীও।
গতকাল মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। আগামী তিনদিনের মধ্যে বৃৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৩ হাজার ৪৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বান্দরবানে ২৬৮ মিলিমিটার।
সমুদ্রবন্দরের সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর সমতল পানি বাড়ছে। যা আগামী তিনদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
বাপাউবো জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব প্রধান নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে উক্ত সময়ে এ অঞ্চলের প্রধান নদ-নদীগুলোর (সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সারিগোয়াইন, ঝালুখালি, ভোগাই-কংশ, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা) পানি সমতল সময় বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
সংস্থাটি জানায়, আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় অতি ভারি বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসায় এই সময় এ অঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর (মুহুরী, ফেনী, হালদা, কর্ণফুলী, সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী) পানি সমতল ধীর গতিতে হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি :
ইমাম খায়ের
টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৬০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি থাকা গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও খাবার পানির সংকট। রাস্তা ভাঙা ও পানিতে ডুবে থাকায় চলাচলের উপায় না পেয়ে এসব গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। সোমবার বিকেলে দেয়াল, পাহাড়ের মাটি চাপা ও পানিতে ডুবে চার শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একাধিক অংশ ভেঙে গেছে। মাতামুহুরী, বাঁকখালী ও ঈদগাও ফুলেশ্বরী নদীর বাঁধ। এসব ভাঙন দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ডুবে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। প্রাথমিক হিসাবে ৫১ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক এবং আড়াই কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টসহ উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
দুর্গতদের মাঝে ইতোমধ্যে ৫৮ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে জেলা প্রশাসন।
আবহাওয়া অফিসের কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানায়, রোববার বিকেল ৩টা থেকে সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার ১২টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৯৩ মিলিমিটার। আরও কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, ভারি বর্ষণের কারণে সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়কে দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দোহাজারী হাইওয়ে থানার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশের হাশিমপুর কসাইপাড়া, পাঠানীপুল, দোহাজারী পৌরসভার কলঘরব্রিজ এলাকায় রাস্তার উপর প্রায় আড়াই ফুট এবং সাতকানিয়ার কেউচিয়ার নয়াখাল, নতুন রেললাইন, কেরানীহাটবাজার এবং ছদাহার হাসমতের দোকান এলাকায় মহাসড়কের উপর দিয়ে একফুটের বেশি পানি উজান থেকে ভাটির দিকে প্রবাহিত হলে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। কিছু বড় যান ধীরগতিতে চললেও ছোট ও মাঝারি যান চলাচল বন্ধ থাকে। এর আগে সোমবার থেকে বান্দরবান সড়কের বাজালিয়া এলাকায় পানি উঠে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়।
এদিকে সামুদ্রিক জোয়ারের ঢেউতে মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা পয়েন্ট, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। মেরিন ড্রাইভের কিছু অংশে জিওব্যাগে বালির বাঁধ তৈরি করে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও নতুন করে আরও কয়েকটি স্পটে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার রাতের বৃষ্টি মুষলধারে বৃষ্টিতে শহরের পর্যটন জোনের প্রধান ও উপসড়কে এক-দেড়ফুট পানি প্রবাহিত হয়। নিচু লেভেলে থাকা অনেক হোটেলের নীচতলায় পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়। সৈতকপাড়ায় অনেক বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকেছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। একই অবস্থা পাহাড়তলী, লাইটহাউজ ও রহমানিয়া মাদ্রাসা এলাকাতেও।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী আমার বার্তাকে জানান, পাহাড়ি ঢল, বৃষ্টি এবং জোয়ারের ঢেউতে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চকরিয়ার পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি। ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে কাকরা, লক্ষ্যরচর, বুমুবিল ছড়ি, সুরেজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, কোনাখালী ইউনিয়ন। মাতামুহুরীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঢলের পানির তোড়ে কইন্যারকুম, বিএমচর, মেহেরনামা বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। আরো একাধিক এলাকায় পাউবোর বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং বৃষ্টি না থামলে ভয়াবহ বন্যার শঙ্কা রয়েছে।
জেলা পরিষদের ঈদগাও উপজেলার সদস্য মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ঈদগাও ফুলেশ্বরী নদীর বাঁধ ভেঙে ঈদগাওর জালালাবাদ, ঈদগাও, ইসলামাবাদ, ইসলামপুর, পোকখালী ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রামে বন্যার পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে গ্রামের সড়কগুলোও। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কৃষিজমিসহ তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর আমনের বীজতলা। তলিয়ে গেছে মাছের ঘের, হ্যাচারি, পুকুর।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা মুস্তফা আমার বার্তাকে জানান, উপজেলার ফতেখাঁরকুল, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, চাকমারকুল, রাজারকুল, জোয়ারিয়ানালা, দক্ষিণ মিঠাছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার পানিবন্দি মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বাঁকখালীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় তীব্র স্রোতে বিভিন্ন গ্রামের সাঁকো ভেসে গেছে। ফলে স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পারাপার করছেন। বন্যাদুর্গতের জেলা প্রশাসকের দেয়া ২ মেট্টিক টন চাল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। দেয়া হচ্ছে শুকনো খাবারও।
কক্সবাজার সদরের ঝিলংঝা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা নিচু হাওয়ায় পানিতে ডুবে আছে। এসব এলাকার লোকজনকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়।
পেকুয়ার ইউএনও পূর্বিতা চাকমা জানান, পাহাড়ি ঢলে পেকুয়া সদর ইউনিয়ন, উজানটিয়া, মগনামা, টৈটং, বারবাকিয়া, শিলখালী ও রাজাখালী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানি, খাবারের সংকট দেখা গেছে। বানৌজ শেখ হাসিনা সড়কসহ অনেক সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অধিকাংশ গ্রামে বাসাবাড়ি পানিবন্দি।
অপরদিকে, গত সোমবার (৭ আগস্ট) বিকেলে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড সবুজ পাড়া (বরঘোনা) এলাকার মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের দুই শিশু সন্তান তাবাচ্ছুম (১) ও মোহাম্মদ সাবিদ(৫) বাড়ির দেয়াল চাপা পড়ে মারা যায়। এসময় আহত হয়েছেন নাজিম, তার স্ত্রীসহ আরও চারজন। একই সময়ে উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৯ এর এ/৬ ব্লকে ঘরের উপর পাহাড় ধসে ওই ক্যাম্পের আনোয়ার ইসলামের স্ত্রী জান্নাত আরা (২৮) এবং তাদের মেয়ে মাহিম আক্তার (২) মারা যায়। একই সময়ে রামুর রাজারকুলের মৌলভীপাড়ায় বাড়ির উঠানে আসা বন্যার পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে সৌদি প্রবাসী মৌলভী ওবাইদুল হকের শিশু কন্যা সামিয়া (২)।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশ আমার বার্তাকে জানান, জেলার ৬০ ইউনিয়নে তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত তিন উপজেলায় প্রাণহানি হয়েছে ৫ জনের। দুর্গত মানুষদের জন্য ২০৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। সেসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। চকরিয়া-পেকুয়ায় ৪৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক, উখিয়ায় ৩ কিমি কাঁচা সড়ক এবং টেকনাফ মহাসড়কে আড়াই কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবর্ষণে দুর্গতদের ইতোমধ্যে ৫৮ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে সকল বিভাগ একীভূত হয়ে কাজ করছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন : ভারি বর্ষণের ফলে কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় চলমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন কর্তৃক আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উখিয়া- টেকনাফে অবস্থিত বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল কার্যক্রম শুরু করেছে। ১০ পদাতিক ডিভিশন কর্তৃক কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ ও বিভিন্ন তথ্যের জন্য রামু সেনানিবাসে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
সাজেক-খাগড়াছড়ি যান চলাচল বন্ধ। আটকা পড়েছেন পর্যটকরা
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি : গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সড়কের একটি কালভার্ট ডুবে যাওয়ার কারণে সাজেক-খাগড়াছড়ি যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মেঘের রাজ্য খ্যাত সাজেকে যাতায়াতের পথ বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে সাজেকে তিনশ’ থেকে চারশ’ পর্যটক অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, চলমান অতি ভারি বর্ষণের ফলে উজান হতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার প্রধান সড়কের একটি কালভার্ট ডুবে গেছে। এতে খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা যান চলাচল সাময়িক বন্ধ আছে। যেহেতু সাজেকে দীঘিনালা হয়ে যাতায়াত করতে হয়, তাই সাজেকে যাতায়াতের পথও সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। গতকাল মঙ্গলবার সাজেক থেকে কোনো গাড়ি ছেড়ে আসেনি বা বাঘাইহাট থেকেও সাজেকে কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে পারেনি। তাই সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের আজ সাজেকেই অবস্থান করতে হয়েছে।
সাজেক হিল ভিউ রিসোর্টের মালিক ইন্দ্রজিৎ চাকমা বলেন, দীঘিনালা-বাঘাইহাট সড়ক বন্ধ থাকার কারণে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক যাদের আজ ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তারা ফিরতে পারেননি। নতুন কোনো পর্যটকও আসেনি আজ। এই মুহূর্তে সাজেকে ১৫০-২০০ পর্যটক অবস্থান করছেন এবং সবাই ভালোভাবেই আছেন।
সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা আমার বার্তাকে বলেন, বাঘাইহাটে যাতায়াত বন্ধ থাকার কারণে সাজেকে পর্যটক যাতায়াত আজ বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ থেকে গাড়ি ছাড়তে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোনো গাড়ি আসেনি, যায়নি। তাই নতুন কোনো পর্যটক আসেননি এবং অবস্থানরত পর্যটকদের সাজেকেই থাকতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সাজেকে বর্তমানে দুই থেকে তিনশ’ পর্যটক অবস্থান করছেন। পর্যটকদের জন্য সব কটেজ রিসোর্টের ভাড়া ৫০% করে দিয়েছি। পাশাপাশি যাদের আজকের জন্য অগ্রিম বুকিং ছিল তাদের টাকাও রিটার্ন করার জন্য বলে দেয়া হয়েছে। অগ্রিম বুকিং করা কোনো পর্যটক যদি পরবর্তীতে আসতে চান তাহলে আমরা সেটা সমন্বয় করে দেব।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আক্তার আমার বার্তাকে বলেন, দীঘিনালায় যে কালভার্টটি ডুবে গেছে সেটি রিকভার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাঘাইহাট বাজার এবং মাচালং সেতুতে পানি উঠে ডুবে গেছে। যেহেতু বাঘাইহাট থেকে মাচালং পর্যন্ত দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার, এই দীর্ঘ পথটি পর্যটকদের পক্ষে পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। তাই সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের অপেক্ষা করার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলেছি, তারা পর্যটকদের জন্য ডিসকাউন্ট দিচ্ছেন। পর্যটকদের কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমানে সাজেকে তিনশ’ থেকে চারশ’ পর্যটক আছেন।
সড়কে আটকা পড়ে আছেন অনেকে :
ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় থাকেন পাভেল। তার অপর বন্ধুরা হলেন মনির, আল আমীন ও সাগর। তারা ঢাকায় ব্যবসা করেন। অনেক দিন পর বেড়াতে যাচ্ছিলেন কক্সবাজারে। মোবাইলে আমার বার্তার এই প্রতিবেদককে পাভেল বলেন, ‘আগেও কক্সবাজার গিয়েছি। তবে এবার বর্ষায় যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে যে কষ্টে পড়ব, বুঝিনি।’
চন্দনাইশের কসাইপাড়া যেখান থেকে পানি উঠেছে, সেখানে থেমে আছে বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাস। কক্সবাজারমুখী বাসটির চালক মো. রুবেল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাত তিনটা
থেকে এই জায়গায় আটকা পড়েছি। গাড়িতে তেল কম। তাই এসি বন্ধ করে বসে আছি। যাত্রীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কখন নাগাদ গাড়ি চলাচল শুরু হবে, তা জানি না।’
ওই গাড়ির যাত্রী জাহিদুল ইসলাম আমার বার্তাকে বলেন, ‘রাত সাড়ে আটটায় ঢাকা থেকে রওনা হয়েছি। কিন্তু এখানে এসে রাত তিনটা থেকে আটকে আছি। কক্সবাজারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজে আমরা সাতজন যাচ্ছিলাম। এক মাসের জন্য সেখানে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কখন যে পৌঁছাব, জানি না।’
চন্দনাইশ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জিমরান মো. সায়েক এই প্রতিবেদককে বলেন, বিভিন্ন জায়গায় পানি ওঠার কারণে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ভোর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। বিভিন্ন জায়গায় গাড়িও নষ্ট হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম নগরের পরিস্থিতি ভয়াবহ
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
অব্যাহত টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগর চার দিন থেকেই তলিয়ে আছে। পানিবন্দি হয়ে আছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। আনোয়ারায় পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে পাহাড় ধসে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়ায় দুই শিশু এবং উখিয়ায় মা-শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত রোববার এ বন্দর নগরীতে বৃষ্টি হয় ৩২২ মিলিমিটার। ১৯৮৫ সালের ৯ জুলাই শুধু চট্টগ্রাম শহরে ৩৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরেছিল। উপকূলের অন্য জেলাগুলোতেই ওই দিন ৩০০ মিলিমিটারের ওপরে বৃষ্টি হয়। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর আবারও গতকাল রোববার এমন প্রবল বৃষ্টি হলো চট্টগ্রামে। গত রোববার চট্টগ্রামে ৩২২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামে আগের দিন রোববারের চেয়ে পরের দিন সোমবার বৃষ্টিপাত কমেছে। সেটিও সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ মিলিমিটার।
বান্দরবানে চরম জনদুর্ভোগ
বান্দরবান প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের পর বান্দরবান শহরও তলিয়ে গেছে। বান্দরবানের সঙ্গে অন্যান্য জায়গার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এদিকে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে পাহাড় ধসে মা-মেয়ে নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে গত সোমবার বান্দরবানের বৃষ্টি চট্টগ্রামকেও ছাড়িয়ে গেছে। এদিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই পার্বত্য জেলায় ৩৪২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে বান্দরবানে পাহাড় ধসে একই পরিবারের দুজন নিহত হয়েছেন। সম্পর্কে তারা মা-মেয়ে। গত সোমবার দুপুরে বান্দরবান পৌরসভার কালাঘাটা গোধার পাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বান্দরবান সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার অজিত দাস বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত সোমবার দুপুরে পাহাড় ধসে বান্দরবান সদরে একই পরিবারের মা-মেয়ে নিহত হয়েছেন। তারা পৌরসভার কালাঘাটা গোধার পাড় এলাকার বাশি শীলের স্ত্রী ও মেয়ে বলে জানা গেছেন। তাদের মধ্যে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বান্দরবান সদর উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, বান্দরবান শহরের অর্ধেক অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। বান্দরবানের আশপাশের এলাকা যেমন: ক্যামলং, মাঘমারা, বালাঘাটা, ক্যচিংঘাটা, তংপ্রু পাড়া, ধোপাছড়াসহ অনেক এলাকার জনসাধারণ এখন পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগের মধ্যে আছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন থেকে ১৯২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মোট কতজন আশ্রয় নিয়েছেন তা জানা যায়নি। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পার্বত্য তিন জেলাসহ ৫ জেলায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ :
টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ায় তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার এসব এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ‘এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে জাতীয় মনিটরিং ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা’ শেষে এ ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এজন্য বুধ-বৃহস্পতিবার এসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। আশা করছি, আগামী দুই দিনের মধ্যে সব এলাকার পানি নেমে যাবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। আগামী রোববার থেকে এ ৫ জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথারীতি ক্লাস শুরু করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী।
এদিকে সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, আগামী ১৭ আগস্ট থেকেই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এ পরীক্ষা পেছানোর কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আগামী ১৪ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৪৩ দিন কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এবি/ওজি

