
ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে ধীরগতির অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। দেশটিতে দুর্যোগের শুরুর দিকে সেনা মোতায়েনে ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের কাছ থেকে নির্দেশ পেতে বিলম্ব, মৌলিক সরঞ্জামের অভাব এবং সার্বিক বিভ্রান্তি উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করেছিল।
শনিবার (১৮ জুলাই) আটটি সূত্রের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে সংঘটিত ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। যদিও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপসহ বিশেষজ্ঞরা মৃতের প্রকৃত সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন। এতে লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ, সামরিক কর্মী ও অন্যান্য কর্মকর্তারা উদ্ধারস্থলে দেরিতে পৌঁছেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রদ্রিগেজ বলেছেন, ভূমিকম্পের পরপরই ৪ হাজার কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে বাসিন্দারা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় সামরিক সদস্য ও পুলিশকে প্রায় দেখাই যায়নি।
দেশটিতে দুর্যোগের পর প্রথম দুই দিনে বেসামরিক নাগরিকরাই উদ্ধারকাজের বেশিরভাগ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ছুটে আসেন এবং সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের উদ্ধার করেন। পরে তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল, দমকলকর্মী, বেসামরিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সীমিতসংখ্যক ভেনেজুয়েলার সৈন্য যোগ দেন। তারা রয়টার্সকে জানান, সরাসরি আদেশ পেয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় এই প্রায়ই ভয়াবহ কাজে অংশ নিয়েছিলেন।
কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে পরিচিত অন্যান্য সূত্র এবং কূটনৈতিক মহলের সূত্র জানিয়েছে, মোতায়েনের আদেশে বিলম্ব, সংকট সমন্বয়ের দায়িত্বে কে থাকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবের কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সীমিত ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মরত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিজেদের ইচ্ছায় কাজ করি না; আমরা সরাসরি আদেশ পাই। আমাকে আদেশ না দেওয়া হলে আমি আমার ইউনিটকে কোনো নির্দেশনা দিতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশ রক্ষার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা থাকে, সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা আমাদের ছিল না। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’
২৪ জুনের ভূমিকম্পের পরের দিন অফিসার ইউনিটের একদল সৈন্য স্থানীয় জনবলকে সহায়তা করতে তে লা গুয়াইরায় গিয়েছিল। এতে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কোনো প্রস্তুতি বা রসদ ছাড়া রওনা হতে যাচ্ছিলাম না, কারণ স্পষ্টতই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কেউই প্রস্তুত থাকে না। কারাকাসে থাকা সৈন্যদের অন্তত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধ্যমতো সহায়তা করার জন্য পাঠানো উচিত ছিল।’
কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সর্বত্র বিভ্রান্তি বিরাজ করছিল। কোনো পরিকল্পনা ছিল না এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ প্রদানের ধারাবাহিকতাও দুর্বল ছিল। ফলে অনেকেই জানতেন না কী করতে হবে।
সূত্রটি আরও জানায়, নির্দেশ জারিতে বিলম্বের কারণে প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এসে পৌঁছানো আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীদের মোতায়েনও ব্যাহত হয়েছিল। ফলে এমন মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে, যখন আরও মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল।
উদ্ধারকারীদের অনুসন্ধান এলাকা বণ্টনে বিলম্বের বর্ণনা দিয়ে সূত্রটি বলেছে, ‘সবাই আদেশের অপেক্ষায় ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাজ করে তিরস্কারের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে তারা বরং কিছুই না করাকেই শ্রেয় মনে করে।’
সামরিক বিষয় সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, মেরিন ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডটি অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু সে ধরনের কোনো নির্দেশ পায়নি।
আরেকটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সেনা পাঠানোর জন্য তাদের ইউনিটের কাছে পর্যাপ্ত যানবাহন ছিল না। অন্যদিকে আরও তিনটি সূত্র বলেছে, ইউনিটগুলোর কাছে হাতুড়ি, কোদাল এবং নাইট ভিশন-সক্ষম হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও অভাব ছিল।
সূত্র: রয়টার্স

