
# দুদকের মামলায় ফাঁসতে পারে পরিচালনা পর্ষদ
# সংবাদ না করে সুসম্পর্ক গড়ার প্রস্তুাব
অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেপরোয়া দুর্নীতির কবলে পড়ে ভয়াবহ সংকটকাল পার করছে যমুনা ব্যাংক পিএলসি। একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং সুশাসনের চরম অভাবে ব্যাংকটির ওপর আস্থা হারিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা। এর মধ্যেই ব্যাংকটিতে এক বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের মালিক আনোয়ার হোসেন খান যমুনা ব্যাংক থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি-বিধান সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ অবৈধভাবে পুনঃতফসিলও করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে এই ঋণ কেলেঙ্কারির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলায় শিগগিরই জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের মতে, সাবেক ওই সংসদ সদস্যকে অসাধু উপায়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং ব্যাংকিং নীতিমালা ভাঙার অপরাধে যমুনা ব্যাংকের বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদের প্রায় সব সদস্যই দুদকের দায়ের করা মামলায় আসামি হতে যাচ্ছেন।
মামলায় আসামি হওয়ার তালিকায় আছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো: বেলাল হোসেন, পরিচালক রবিন রাজন সাকাওয়াত, ইঞ্জিনিয়ার মো: আতিকুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার এ.কে.এম মোশাররফ হোসাইন, মো: রেদোয়ান-উল-করিম আনসারী, তাসমিন মাহমুদ, আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ, মো: মাহমুদুল হক, শাহীন মাহমুদ, মো: সিরাজুল ইসলাম ভরসা, কানুতোষ মজুমদার এবং মো: ইসমাইল হোসেন সিরাজি। আনোয়ার হোসেন খানকে ঋণ দেওয়া ও আত্মসাতে সহযোগিতায় এসব ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে, এই তালিকার কয়েকজন এখন আর যমুনা ব্যাংকের সঙ্গে নেই বলে জানিয়েছে ব্যাংকটির জনসংযোগ শাখা।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে ব্যাংকটি থেকে আমানত কমেছে অবিশ্বাস্য হারে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে গ্রাহকদের আমানত ৬,৫২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা থাকলেও ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪,৯০৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে আমানতকারীদের ১,৬১৫ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ তুলে নিয়ে ব্যাংকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। একই সময়ে ব্যাংকের নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম ৮৮ শতাংশের বেশি কমে ৩৭.৫৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
ব্যাংকটিতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও খেলাপি ঋণাক্রান্ত এক্সিম ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ারে অবৈধ বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি অপচয় করা হয়েছে। শাখা পর্যায়েও চেপে বসেছে জালিয়াতির চক্র; বগুড়ার বড়গোলা শাখা থেকে ১৬ কোটি টাকা ও আগ্রাবাদ শাখা থেকে ১১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। যশোর শাখার কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার দাসের ১০ কোটি টাকা পাচারের ঘটনা আদালতে গড়িয়েছে।
এমনকি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইটি সরঞ্জাম কেনায় অনিয়ম এবং ৭৫ কোটি টাকা লোপাটে সহায়তার বিস্ফোরক অভিযোগ দুদকের তদন্তাধীন।
এসব গুরুতর অনিয়ম ও সম্ভাব্য মামলার বিষয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, সিএফও এবং এমডির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে ব্যাংকটির জনসংযোগ শাখায় যোগাযোগ করলে শাখা প্রধান বলেন, 'দুদকের অনুসন্ধান বিষয়ে আমাদের জানা নেই। তবে ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব তথ্য শোনা যায় তা সঠিক নয়।' জনসংযোগ শাখা থেকে ব্যাংকের বিষয়ে নেতিবাচক সংবাদ না করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার অনুরোধ করা হয়।

