ই-পেপার সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২

সার্কুলার মডেল বাস্তবায়নে কে নেতৃত্ব দিবে? রাষ্ট্র, শিল্প নাকি নাগরিক সমাজ

সাকিফ শামীম
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:১৭

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার যখন অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়েছে, তখন 'লিনিয়ার ইকোনমি' বা 'ভোগ করো ও ফেলে দাও'—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা একটি অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা। এই প্রেক্ষাপটে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—এই আমূল পরিবর্তনের নেতৃত্বে থাকবে কে? রাষ্ট্র, শিল্পখাত নাকি নাগরিক সমাজ?

সার্কুলার মডেলের মূল ভিত্তি হলো ‘রিডিউস, রিইউজ এবং রিসাইকেল’। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং পণ্যের জীবনচক্র দীর্ঘস্থায়ী করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই জটিল ও সুদূরপ্রসারী রূপান্তর কোনো একক পক্ষের পক্ষে সফল করা অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, শিল্প এবং নাগরিক সমাজের একটি সুসংহত এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

যেকোনো জাতীয় পরিবর্তনের প্রাথমিক কারিগর হলো রাষ্ট্র। সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে নীতিনির্ধারক হিসেবে। একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এবং প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন টেকসই হয় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন কিছু নীতিমালা তৈরি করা যা রিসাইক্লিং শিল্পকে উৎসাহিত করবে। গ্রিন ট্যাক্স সুবিধা প্রদান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র শিল্পখাতকে একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে। যখন রাষ্ট্র একটি সহায়ক ইকোসিস্টেম তৈরি করে দেয়, তখন বাকি অংশীজনদের জন্য কাজ করা সহজ হয়ে যায়।

এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে সরকারকে কৌশলগতভাবে তহবিল সংগ্রহ বা ফান্ড রেইজ (Fund Raise) করতে হবে। বিশেষ করে ‘সোভেরেন গ্রিন বন্ড’ ইস্যু করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করা যেতে পারে যা শুধুমাত্র টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে। একই সাথে, একটি কার্যকর ‘কার্বন ক্রেডিট মার্কেট’ (Carbon Credit Market) প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে কার্বন ট্যাক্স ও এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব কার্বন মার্কেট তৈরি করতে পারে, তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিনিময়ে ক্রেডিট বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবে। এর ফলে বেসরকারি খাত পরিবেশ রক্ষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

শিল্পখাত বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি। কারণ তারাই পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাত করে। একজন স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোক্তা হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত দেখি, আধুনিক হাসপাতাল বা বৃহৎ শিল্পকারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা চ্যালেঞ্জিং। শিল্পখাতকে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। পণ্য তৈরির সময়ই খেয়াল রাখতে হবে তা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ব্যবহারের পর সহজেই পুনরায় ব্যবহারযোগ্য (Reusable) করা যায়। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচও কমিয়ে আনে। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো যায়, সেই গবেষণায় শিল্পখাতকে বিনিয়োগ করতে হবে। শিল্প যখন মুনাফার পাশাপাশি পরিবেশের দায়ভার গ্রহণ করবে, তখনই সার্কুলার মডেল পূর্ণতা পাবে।

শিল্পখাতের এই অগ্রযাত্রায় আমাদের নবীন উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপ-দেরকে বড় পরিসরে সুযোগ দিতে হবে। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste-tech) এবং সার্কুলার সাপ্লাই চেইন নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপগুলোই পারে প্রথাগত শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে। এদের সহায়তায় দেশে আরও বেশি ‘ক্লিন এনার্জি ফার্ম’ (Clean Energy Firm) বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ লিনিয়ার ইকোনমির তুলনায় তিনগুণ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। আমাদের শিল্পাঞ্চলগুলোতে যদি সোলার বা বায়োগ্যাস ভিত্তিক ক্লিন এনার্জি ফার্ম গড়ে তোলা যায়, তবে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে প্রথাগত ব্যাংক ঋণের চেয়ে ‘ইক্যুইটি ফাইন্যান্স’ (Equity Finance) বা অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ বেশি কার্যকর। যখন বিনিয়োগকারীরা স্টার্টআপ বা ক্লিন এনার্জি প্রজেক্টে ইক্যুইটি প্রদান করবে, তখন উদ্যোক্তারা ঋণের বোঝা ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদী এবং ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে পারবেন। এছাড়া, একটি ‘ক্রেডিট এক্সচেঞ্জ হাউজ’ (Credit Exchange House) তৈরি করা যায় কিনা তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে যেখানে কার্বন ক্রেডিট, গ্রিন ক্রেডিট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্টিফিকেটগুলো স্বচ্ছতার সাথে কেনাবেচা করা যাবে, যা পুরো সার্কুলার মডেলকে একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি প্রদান করবে।

সবশেষে আসে নাগরিক সমাজ। সাধারণ মানুষের অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন ছাড়া কোনো মডেলই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে না। সচেতন ভোক্তা হিসেবে নাগরিক সমাজই পারে বাজারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে।

যখন জনগণ পরিবেশবান্ধব এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের প্রতি আগ্রহী হবে, তখন শিল্পখাত বাধ্য হবে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে। নাগরিক সমাজ যদি বর্জ্য আলাদা করার (Waste Segregation) অভ্যাস গড়ে তোলে এবং স্থায়িত্বের সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তবেই রাষ্ট্রের নেওয়া উদ্যোগগুলো সফল হবে। এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে হবে।

বাস্তবিক অর্থে, সার্কুলার মডেল বাস্তবায়নে নেতৃত্ব কোনো একজন নির্দিষ্ট মানুষ, জাতি কিংবা গোষ্ঠীর হাতে নয়, বরং এটি একটি ‘ত্রিমাত্রিক অংশীদারিত্ব’। রাষ্ট্র পথ দেখাবে, শিল্পখাত সেই পথে হাঁটবে এবং নাগরিক সমাজ সেই যাত্রাকে সমর্থন ও ত্বরান্বিত করবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সম্পদ সীমিত কিন্তু সম্ভাবনা অসীম। আমরা যদি আজ লিনিয়ার মডেল থেকে বেরিয়ে এসে সার্কুলার মডেল গ্রহণ না করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেবল একটি জঞ্জালভরা পৃথিবী রেখে যাব। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিনিধি হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন পরিবেশের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে চলে। সার্কুলার ইকোনমি কেবল একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়, এটি একটি সুন্দর ও সুস্থ পৃথিবীর বেঁচে থাকার দর্শন। রাষ্ট্র, শিল্প এবং নাগরিক সমাজ—আমরা সবাই যখন এক সুরে কথা বলব, তখনই শুরু হবে এক নতুন এবং টেকসই পৃথিবীর যাত্রা।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই

সিলভার ইকোনমি: বার্ধক্য কি বোঝা, নাকি বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই একটি তরুণ দেশের গল্প হিসেবে তুলে ধরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কিংবা

অচল চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচান, অর্থনীতি রক্ষা করুন

দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত অচল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: সংঘাত নাকি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে জটিল এবং অমীমাংসিত সমীকরণটির নাম ‘মধ্যপ্রাচ্য’। গত কয়েক দশকে এই

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, গণভোট এবং জুলাই সনদের ধারণ সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাপানের বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে: বাণিজ্য উপদেষ্টা

কারা অধিদপ্তরকে ১৩ হাজার ধর্মীয় বই উপহার দিচ্ছে ধর্ম মন্ত্রণালয়

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বাস্তবায়নে আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন সুজনের

বিএনপিকে ভোট দিতে চান ৪৪.১০% ভোটার, জামায়াতকে ৪৩.৯০%

দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে নাকি বেহেশতে যাওয়া যাবে-নাউজুবিল্লাহ: ফখরুল

বিএনপির অভিজ্ঞতা আছে দেশকে দুর্নীতি থেকে বের করার: তারেক রহমান

নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত: বিজিবি মহাপরিচালক

প্রজাতন্ত্রের সরকার প্রধান কি কাজ করছে, এটা জানার অধিকার সবার

ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল নিতে বাধা নেই

ঢাকাসহ দেশের সব গণতন্ত্রী মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান তারেক রহমানের

নাহিদ ‘ডোমিনিকার নাগরিক’ অভিযোগ, প্রার্থিতা স্থগিত চেয়ে রিট

র‌্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্ত চাইলেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম

দাঁড়িপাল্লার পক্ষে প্রচারণা করায় সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছি: ডা. মিতু

সারাদেশে সাড়ে ৩ হাজার কোস্টগার্ড মোতায়েন থাকবে: মহাপরিচালক

নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে ইসির প্রতি আহ্বান

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসআই থেকে ইন্সপেক্টর হলেন ১৫৩ পুলিশ

কুমিল্লা-২: স্বতন্ত্র প্রার্থীর ২৭৮ সমর্থকের বিরুদ্ধে হোমনা থানায় মামলা

মোবাইল ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞায় গণমাধ্যমকে আওতামুক্ত রাখার আশ্বাস

সবাই যেকোনো সময় নিরাপদে চলাচল করবে এমন রাষ্ট্র গড়াই লক্ষ্য: তারেক রহমান

সন্ধ্যার মধ্যে সিদ্ধান্ত বাতিল না করলে ইসি ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি নাহিদের