
টাকার বিনিময়ে জাহাজ পরিচালনার সনদ (কন্টিনিউয়াজ ডিসচার্জ সার্টিফিকেট) বা সিডিসি বানিজ্যের সিন্ডিকেট নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর নিজ সংস্থায় ফেরৎ পাঠানো হয় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলমকে। কিন্তু রহস্যজনক কারনে এখনো বহাল তবিয়তে স্বপদে আছেন সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা খ্যাত সংস্থাটির চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নৌ পরিবহন অধিপ্তরকে করেছেন নানাভাবে বিতর্কিত। যা নিয়ে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা ধরনের গুঞ্জন।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে ভুয়া সিডিসি (কন্টিনিউয়াজ ডিসচার্জ সার্টিফিকেট)। ক্রেতারাও এসব সিডিসি ব্যবহার করে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থার জাহাজে নাবিক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। এরপরেই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ নোঙ্গর করলে পালিয়ে যাচ্ছেন সেখান থেকে। এভাবে চলতে থাকলে বিদেশী জাহাজে নিষিদ্ধ হতে পারে বাংলাদেশী নাবিক। বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যেই দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে এসব অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদের নেতৃত্বেই হয়েছে এসব। তিনিই মূলত সিডিসি জালিয়াত চক্রের মূল খলনায়ক। এসব কাজে তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ফারুক খান, সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সংসদ মোঃ সাইফুজ্জামান শেখর, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপ-সচিব সৈয়দ আলী আহসান, তৎকালীন নৌ শিক্ষা শাখার উপ-সচিব শুকরিয়া পারভিন ও নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম এবং মো. নিজামুল হক।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোঃ শফিউল বারী এ ব্যাপারে বলেন, আমার এসব বিষয়ে নজরে আসেনি। তবে এসব বিষয় তদন্ত কিংবা ব্যবস্থা গ্রহনের দায়িত্ব নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই নৌ পরিবহন অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রনালয়ে ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদের ব্যাপারে নোট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কার্যকরী তেমন কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাইনি।
তথ্য বলছে, নীতিমালা লঙ্ঘন করে সিডিসি প্রদান করায় এরইমধ্যে হাইকোর্টে একজন নাবিক রীট দায়ের করেছেন। এছাড়া নৌ পরিবহন অধিদপ্তর পলাতকদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করেছেন। এসব কাজে ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদকে তৎকালীন সময়ে সহযোগিতা করেছেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সহকারি কেমিস্ট ফাওজিয়া রহমান এবং টেকনাফ সেন্টমার্টিন রুটে তৎকালীন ট্যুর অপারেটর সমিতির নেতা ও জাহাজ ব্যবসায়ি (বে-আইনীভাবে ইনল্যান্ডের জাহাজ জোর করে উপকূলীয় এলাকায় চালাতেন) তোফায়েল আহমেদ ওরফে টেকনাফ তোফায়েল, নৌ প্রতি মন্ত্রীর এপিএস মো. বাশার, নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের সাবেক সচিব মোস্তফা কামালের পার্সোনাল অফিসার সেকান্দার আলী, সাবেক নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর পি.এস মোহাঃ আমিনুর রহমান ও রিলায়েন্স শিপিং এর মালিক ক্যাপ্টেন খায়ের। এছাড়া বহিরাগত দালাল সাগর, মুন্না ও তুষারের সমন্বয়ে আরো একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ক্যাপ্টেন গিয়াস।
জানা গেছে, নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদিত প্রাইভেট মেরিন একাডেমি ৭টি। এগুলোর কয়েকটিতেই ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদের স্ত্রী মোসাম্মৎ সাজেদার নামে মালিকানা অংশ রয়েছে। এছাড়া সিআইডি পুলিশের কাছে জালিয়াতীতে ধরা খেয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ওজিমা নামক মেরিন একাডেমির কাগজপত্রে ক্যাপ্টেন গিয়াসের ৫১ শতাংশ মালিকানা দেখা যায়।
তথ্য আরো বলছে, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ক্যাপ্টেন মোঃ গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ২০১২ নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার পদে নিয়োগ পান। পরে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৪ সাথে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে পতিত সরকারের প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া হয়। নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পতিত সরকারের আমলে নৌপরিবহনের তিনটি বড় পদ অর্থাৎ কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এডুকেশন, চট্টগ্রাম মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসের প্রিন্সিপাল অফিসার এবং সর্বশেষ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার বাগিয়ে নেন গিয়াস উদ্দিন।
জানা যায়, মো. মনোয়র হোসাইন নামের এক ব্যক্তিকে ভূয়া ইন্দোনেশিয়ান সনদের বিপরীতে বাংলাদেশি সার্টিফিকেট অব ইকুইভেলেন্সি প্রদান করা হয়। তার সিডিসি নং সি/ও/৫৬৪৮। একই ভাবে আবুল বসর মোহাম্মদ নুরুজ্জামান আকন্দ নামের একজনকেও ভূয়া ইন্দোনেশিয়ান সনদের বিপরীতে বাংলাদেশি সার্টিফিকেট অব ইকুইভেলেন্সি প্রদান করা হয়। তার সিডিসি নং সি/ও/৪৯০৯। কিন্তু তদন্তে ধরা পড়ে জালিয়াতি। বিষয়টি উদঘাটন করেন শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাসার।
ফাইল দুটি বিশ্লেষন করে দেখা যায়, ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ ভূয়া ইন্দোনেশিয়ান সনদকে সঠিক বলে প্রত্যায়ন করে এই সনদ দুটি পেতে সহায়তা করেছেন। এভাবে একই প্রক্রিয়ায় তিনি কয়েক শত ভূয়া সনদ পাইয়ে দিয়েছেন ক্যাপ্টেন গিয়াস। আর ভূয়া সনদ দিয়ে বিদেশী সংস্থার জাহাজে নিয়োগ পেয়ে দেড় শতাধিক নাবিক ইউরোপ আমেরিকায় পালিয়ে গেছে।
ইঞ্জিনিয়ার শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার আবুল বাসার এ বিষয়ে আমার বার্তাকে বলেন, নৌ পরিবহন অধিদপ্তর সিডিসি প্রদানের জন্য নাম সম্বলিত আবেদন পত্রগুলো যাচাই বাছাইয়ের জন্য আমাকে কমিটির সদস্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু প্রক্রিয়াটি ও নামের তালিকা নিয়ে অসঙ্গতির সন্দেহ হলে আমি সহ কমিটির দুই জন সদস্য যাচাই বাছাইয়ের রিপোর্টে স্বাক্ষর করিনি। শুধুমাত্র চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার (সিএনএস) ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ ভূয়া সুপারিশ করে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন।
নথি পর্যালোচনা ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, প্রি-সী স্পেশাল রেটিং কোর্স নামে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদিত কোনো কোর্স না থাকা সত্ত্বেও অনাবাসিক প্রি-সী স্পেশাল রেটিং কোর্স ২০২৩ চালু করে এবং চট্টগ্রাম ন্যাশনাল মেরিটাইম ট্রেনিং ইনিষ্টিটিউটে প্রশিক্ষন দেয়। এই প্রশিক্ষন অনুমতির জন্য আবেদনকারীর পূর্ন নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা নম্বর ও মোবাইল নাম্বর কিছুই নেই। আবেদনপত্রের সাথে প্রশিক্ষন গ্রহন করতে আগ্রহীদের তালিকাও সংযুক্ত নেই। তাছাড়া বে-আইনীভাবে জারি করেছেন পানামা সার্টিফিকেট, বেলিজ সার্টিফিকেট, হালদিয়া সার্টিফিকেট, মালয়েশিয়ান সার্টিফিকেট, ফিলিপাইন সার্টিফিকেট। পাশাপাশি সরকারি ও অনুমোদিত বেসরকারি মেরিটাইম প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সিডিসি সনদ ধারীরা চাকরী পাচ্ছে না। যার ফলে এ খাত থেকে দেশের বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হাতছাড়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে হাইকোর্টে রীট করলে গত বছর ৫ ফেব্রুয়ারী বিচারপতি এম ডি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের দ্বৈত বেঞ্চ ঘটনা তদন্ত করে দুদককে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
জাহাজের নাবিক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে করা হাইকোর্টের রীটে উল্লেখ করা হয়, নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার (সিএনএস) পদে যোগদানের পর ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ অবৈধ দুর্নীতিবাজ শিপিং মাষ্টার জাকির হোসেনের সাথে যোগসাজশে নীতিমালাকে উপেক্ষা করে নকল পানামা সিডিসি’র অনুকূলে বাংলাদেশি সিডিসি প্রদান করে। ভূয়া পানামা সিডিসি প্রাপ্তরা জাহাজে ওঠার পর ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন বন্দরে পালিয়ে যায়। এরফলে জাহাজ মালিকদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়া লাগে এবং পরবর্তিতে তারা জাহাজে বাংলাদেশি নাবিক নিতে অনিহা প্রকাশ কিংবা নিষিদ্ধ করে। বৈধ পন্থায় পাস করা নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সিডিসি সনদ ধারীরা চাকরী না পাওয়ায় বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হাতছাড়া হচ্ছে। আবার কারো কারো কাজের মান খুবই খারাপ হওয়ায় জাহাজ মালিকরা বাংলাদেশি নাবিকদের নিষিদ্ধ করে।
মামলার বাদী নাবিক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, জাহাজের সিডিসি জালিয়াত চক্রের অন্যতম খলনায়ক ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ। গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ায় গত আওয়ামীলীগ সরকার আমলে ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নৌ পরিবহন অধিপ্তরকে নানাভাবে বিতর্কিত করেছেন। এ সংস্থাটিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এরা স্বার্থের জন্য সকল অনিয়মকে নিজেদের মতো করে যায়েজ করে নিতেন। ভূয়া সিডিসি প্রদান করে চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। পাশাপাশি বঞ্চিত হয়েছেন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত বৈধ সিডিসি প্রাপ্ত যোগ্যরা।
তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহম্মদের অনিয়ম দুর্নীতির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবকিছু জানলেও রহস্যজনক কারনে তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অথচ তিনিই সিডিসি জালিয়াত চক্রের মূল খলনায়ক। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই ব্যবস্থা গ্রহন না করলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
আমার বার্তা/জেএইচ

