ই-পেপার শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩৩

ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) ও উদ্ভাবনী অর্থনীতি: বাংলাদেশের পরবর্তী চালিকাশক্তি

সাকিফ শামীম:
১৭ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:০৮

আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি আর কেবল সস্তা শ্রম বা কাঁচামাল নয়। বরং, এটি জ্ঞান এবং উদ্ভাবনের শক্তি, যা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি দ্বারা সুরক্ষিত। একটি জাতি যখন কেবল পণ্য উৎপাদনের গণ্ডি পেরিয়ে সেই পণ্য তৈরির জ্ঞান ও প্রযুক্তির মালিকানা অর্জন করে, তখনই তার উচ্চতর মুনাফার ভিত্তি তৈরি হয়। স্থানীয় শিল্পে উচ্চতর মুনাফা নিশ্চিত করতে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি সৃষ্টি এবং গবেষণা-ভিত্তিক উৎপাদনের রূপান্তর কৌশল গ্রহণ করা এখন আমাদের জন্য অপরিহার্য।

আমাদের অর্থনীতি এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বহুগুণে বাড়বে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের গতানুগতিক উৎপাদন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D)-এ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) মাত্র ০.০৩% গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় হয় (২০২২-২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা কমিশন)। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ০.৭%, ভিয়েতনামে ০.৫৪% এবং চীনে ২.৫৫%। স্পষ্টতই, এই পরিসংখ্যান আমাদের উদ্ভাবনী অর্থনীতির পথে এক বড় বাধা।

কিন্তু আশার কথা হলো, বেসরকারি খাত থেকে R&D-তে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ অর্থবছরে মোট R&D ব্যয়ের প্রায় ৭২.৬৩% এসেছে দেশীয় উৎস, প্রধানত বেসরকারি খাত থেকে। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছেন।

একটি উদ্ভাবনকে কেবল ধারণার পর্যায়ে রাখলে চলে না, সেটিকে আইনি সুরক্ষা দিতে হয়। এই সুরক্ষার ভিত্তি হলো ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। যখন একটি কোম্পানি তার উদ্ভাবনকে পেটেন্ট, কপিরাইট বা ট্রেডমার্কের মাধ্যমে সুরক্ষা দেয়, তখন এটি একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন করে, যা উচ্চ মুনাফার পথ প্রশস্ত করে। এটি স্থানীয় শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান এনে দেয়।

উচ্চতর মুনাফা অর্জনের জন্য আমাদের স্থানীয় শিল্পকে দ্রুত এই রূপান্তরের দিকে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুচিন্তিত কৌশলগত রোডম্যাপ। জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর TRIPS (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সুযোগ এনে দিতে পারে। এই চুক্তি আন্তর্জাতিক IP সুরক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ করে, যা আমাদের স্থানীয় উদ্ভাবক এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বজুড়ে তাদের মেধা সম্পদ রক্ষা করতে সাহায্য করবে। যখন একটি দেশ TRIPS-এর মতো কঠোর IP মানদণ্ড অনুসরণ করে, তখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে উৎসাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রোসফট (Microsoft) বা সিনজেন্টা (Syngenta)-এর মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা তখনই তাদের অত্যাধুনিক সফটওয়্যার, বীজ প্রযুক্তি বা রাসায়নিক ফর্মুলা নিয়ে কোনো দেশে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে, যখন তারা তাদের পেটেন্ট ও কপিরাইটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের আইনি সুরক্ষা দেখতে পায়। TRIPS চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে উচ্চমানের IP সুরক্ষা নিশ্চিত হলে, কেবল দেশীয় উদ্ভাবকরাই নয়, বরং বিদেশী বিনিয়োগের হাত ধরে আসা উন্নত প্রযুক্তি এবং গবেষণা-ভিত্তিক কর্মসংস্থানও আমাদের অর্থনীতিতে উচ্চতর মুনাফার ভিত্তি তৈরি করবে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটেই আমি আমার নতুন উদ্যোগ, ল্যাবএইড এআই (LABAID AI)-এর কথা বলতে চাই। স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করেছি, ভবিষ্যতের সেবা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক। আমাদের সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ল্যাবএইড এআই-এর যাত্রা শুরু হয়েছে আটটি যুগান্তকারী পেটেন্টের সুরক্ষা নিয়ে। এই আটটি পেটেন্ট বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তো বটেই, বিশ্বেও এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকারের উচিত হবে বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিশেষ কর অব্যাহতি প্রদান করা। বর্তমানে R&D-তে অতিরিক্ত ব্যয়কে রাজস্ব হিসেবে গণ্য করে কর ধার্য করা হয়, যা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। এই নীতি পরিবর্তন করে R&D-এর জন্য একটি পৃথক কর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

দেশের পেটেন্ট, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (DPDT)-এর আধুনিকায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করা আবশ্যক। বর্তমানে আইপিআর সূচকে (Intellectual Property Rights Index) বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল (২০২৫ সালের IPRI অনুযায়ী বৈশ্বিক র‍্যাঙ্ক ১১৪/১২৬), যা বিদেশী বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ল্যাবএইড এআই-এর মতো উদ্যোগগুলি যাতে সহজে তাদের উদ্ভাবন রক্ষা করতে পারে, তার জন্য আইনি সুরক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে স্থানীয় শিল্পের নিবিড় সংযোগ স্থাপন করতে হবে। অ্যাকাডেমিয়াকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গবেষণা করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং উদ্ভাবনগুলিকে বাণিজ্যিকীকরণ করার জন্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে। আমাদের দেশীয় মেধাবী তরুণরাই ল্যাবএইড এআই-এর প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা প্রমাণ করে সঠিক পরিবেশ পেলে তারা বিশ্ব জয় করতে পারে।

পোশাক বা অন্যান্য নিম্ন-দক্ষতা সম্পন্ন খাত থেকে সরে এসে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিটি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি (HealthTech), এবং প্রকৌশল বিদ্যার মতো উচ্চ-প্রযুক্তি এবং জ্ঞান-ভিত্তিক খাতগুলিতে মনোযোগ দিতে হবে। এই খাতগুলিতেই পেটেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প ইতোমধ্যে দেশীয় R&D-তে ভালো ব্যয় করছে (প্রতি কর্মী প্রতি প্রায় ২৩,৭৩৫ টাকা), যা একটি ইতিবাচক দিক।

একটি সফল ব্যবসা শুধুমাত্র লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি মূল্যবোধ তৈরি করে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে জাতি তার মেধা ও উদ্ভাবনকে সুরক্ষা দিতে পারে, সেই জাতিই অর্থনৈতিকভাবে শীর্ষে আরোহণ করে। ল্যাবএইড এআই-এর আটটি বৈশ্বিক পেটেন্ট সহ যাত্রা কেবল একটি ব্যবসার শুরু নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে একটি সুস্পষ্ট বার্তা—আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।

উচ্চতর মুনাফা অর্জন এবং একটি টেকসই অর্থনীতি নির্মাণে আমাদের প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে তাদের মূল মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির সুরক্ষার মাধ্যমে আমরা কেবল আমাদের আজকের সম্পদ রক্ষা করব না, বরং আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দিতা করার ভিত্তি স্থাপন করে যাব। এই পথেই নিহিত আছে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই

ইংরেজি মানেই কি আতঙ্ক নাকি সম্ভাবনা

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ইংরেজি ভাষা। এটি

প্রযুক্তির দাসত্ব বরণ করছি না তো আধুনিকায়নের নামে?

প্রযুক্তি শব্দটি আজ আমাদের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির উপস্থিতি

সার্কুলার মডেল বাস্তবায়নে কে নেতৃত্ব দিবে? রাষ্ট্র, শিল্প নাকি নাগরিক সমাজ

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার যখন অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়েছে, তখন

আইন আছে, বিচার নেই

বাংলাদেশে আইন নেই এই কথাটি শুনতে যতটা সত্য বলে মনে হয়, বাস্তবে তা পুরোপুরি সঠিক
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাঁদাবাজ মুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করার সুযোগ চাই : মন মিয়া 

ঢাকায় ৬ষ্ঠ অ্যাম্বাসি ফুটবল ফেস্ট শুরু

গাজা `বোর্ড অব পিস’ এ স্বাক্ষর করল মরক্কো

আমরা চাইলে ঢাকা শহরে জামায়াতের প্রার্থী রাস্তায় নামতে পারবে না: ইশরাক হোসেন

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

পাকিস্তানে শপিং মলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বেড়ে দাড়িয়েছে ৬৭

সরস্বতী পূজায় তিন দিনের নানা আয়োজন

ব্রাজিলের সঙ্গে চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন আনচেলত্তি

উত্তরবঙ্গকে সৎ ভাই করে রাখা হয়েছে: জামায়াত আমির

বরিশালে মহাসড়কের পাশ থেকে মরদেহ উদ্ধার

সুস্থতা ও নিরাপত্তা আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত

কিশোরগঞ্জে পেট্রোল পাম্পে আগুনে দগ্ধ ৪

এবার এআই অবয়ব দিয়ে শর্টস বানাতে পারবেন ইউটিউবাররা

রমজানের আগেই চড়া চিনি-ছোলার দাম

ধানের শীষের জোয়ার শুরু হয়েছে: আমীর খসরু

জামায়াত আমিরের সমাবেশে জনগণের ঢল

ভোটকেন্দ্র দখল-সিল মারার পাঁয়তারা থাকলে আগেই ভুলে যান: নাহিদ ইসলাম

সংসদ ভেঙে দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় স্কুলের ব্যবস্থাপক গ্রেপ্তার

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় স্কুলের ব্যবস্থাপক গ্রেপ্তার