
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০০ জনেরও বেশি। শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী একজন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ইরানের দাবি, এই হামলায় দেশের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং চাবাহার শহরের শহীদ কালান্তারি বন্দরের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত একাধিক দফায় এই হামলা চালানো হয়। এতে হরমোজগান, বুশেহর, সিস্তান ও বেলুচিস্তান, খুজেস্তান এবং লোরেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় চাবাহারের শহীদ কালান্তারি বন্দরের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে। তবে বন্দরের জেটি, পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অক্ষত রয়েছে। প্রেস টিভির দাবি, বন্দরের ভেতরে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার স্থানীয় সময় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা চাবাহারে অবস্থিত শহীদ কালান্তারি বন্দরের নজরদারি টাওয়ার সফলভাবে ধ্বংস করেছে। সেন্টকমের দাবি, এই টাওয়ারটি এমন একটি সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার অংশ ছিল, যা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওমান উপসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ নজরদারিতে এটি ব্যবহৃত হতো বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, হামলার পরপরই কারিগরি ও পরিচালনাসংক্রান্ত দল ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। পাশাপাশি এলাকা নিরাপদ করা এবং বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ হলে আবার পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু হবে।
হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হরমোজগান প্রদেশ। প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাধিক স্থানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খামির কাউন্টির অন্তত ছয়টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমোজগানের গভর্নরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রদেশটিতে সাতজন নিহত এবং আরো নয়জন আহত হয়েছেন। প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, হামলার কারণে বন্দর আব্বাস, বন্দর খামির ও লার শহরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জরুরি উদ্ধারকারী ও মেরামতকারী দল কাজ করছে। এ ছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় একজন নিহত এবং আরো আটজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। একই শহরের একটি রেলওয়ে শাখা স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বুশেহর প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি বলেছেন, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন আহত হয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর ভালিওল্লাহ হায়াতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আহভাজের আশপাশের এলাকায় হামলা চালিয়েছে। সেখানে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন, আহভাজের কাছে হামলার কারণে ক্যানসার চিকিৎসায় বিশেষায়িত শহীদ বাঘায়ি হাসপাতাল সাময়িকভাবে খালি করতে হয়েছিল। পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর সাঈদ পুরআলি জানিয়েছেন, চেগেনি কাউন্টির ভেইসিয়ান জেলাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক দফায় সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, রসদ সরবরাহের অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, এই অভিযান ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য তৈরি হওয়া হুমকির জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে উত্তেজনার মধ্যেই ইরানও পাল্টা হামলার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির দাবি, তারা বাহরাইন, কুয়েত, সিরিয়া এবং ওমানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

