
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭ আসনে জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। তবে এই জয়ের পেছনে ‘বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার এক চাঞ্চল্যকর প্রভাব সামনে এসেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির জেতা বেশিরভাগ আসনেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি।
এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিতেই আগে কখনো জয় পায়নি বিজেপি। অর্থাৎ, বিজেপি যে ২০৭ আসনে জিতেছে, তার প্রায় অর্ধেক আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভোটার তালিকায় বড় ছাঁটাই
পশ্চিমবঙ্গে মোট ২৯৪টি আসনে নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) কার্যক্রম চালানো হয়। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় মোট প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের বিষয় এখনো ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
তৃণমূল কংগ্রেসসহ অন্য দলগুলো আপত্তি জানালেও বিজেপি শুরু থেকেই এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে আসছিল।
পাল্টে গেছে ভোটের সমীকরণ
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজ্যে সরকারবিরোধী জনমত থাকলেও ভোটার তালিকা সংশোধনও নির্বাচনের ফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বহু আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজয়ী ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।
উদাহরণ হিসেবে বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস আসনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে গত ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূল নয় হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। কিন্তু সংশোধনী প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে ৭ হাজার ৫১৫ জন ভোটার বাদ পড়ার পর বিজেপি এবার মাত্র ৯০০ ভোটে আসনটি জিতে নিয়েছে।
দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিজেপি প্রায় ২৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো আসনটি জেতে। এর আগে এই আসন মূলত বাম দল ও তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল।
তৃণমূলের একাধিক শক্ত ঘাঁটিও ভেঙে পড়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরেছেন। অথচ এই ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেই ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে মমতার মন্ত্রিসভার অন্তত ১০ জন সদস্যকে। টানা ২০ বছর টালিগঞ্জ আসনে জেতা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবার হেরেছেন ৬ হাজার ১৩ ভোটে। অথচ এই কেন্দ্রে নাম বাদ গেছে ৩৭ হাজার ৮৮৯ জন ভোটারের। শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশীষ চক্রবর্তীর মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীদের হারের ব্যবধানের চেয়ে তাদের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
কলকাতার পাবলিক পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণটি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার থাকলে রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। - সূত্র: স্ক্রল ডটইন
আমার বার্তা/এমই

