
একসময় দেশের অর্থনীতিতে পাটই ছিল একমাত্র নিয়ামক। তাই বলা হতো সোনালী আশ। কালের প্রবাহে সেই সুনাম হারিয়েছে পাট। পাট এখন কৃষকের গলার ফাঁস। কথায় আছে কৃষকের কোনো সংগঠন নেই আর নেই লোকসানের লজ্জা। তাই এখনো বিস্তীর্ণ এলাকায় পাট গাছের সারি দেখতে পাওয়া যায়।
কিন্তু সেই পাট নিয়ে কতটা সুখে আছেন কৃষক! তারা কী সময়মত পাটের পরিচর্যা করতে পারছেন? এমন প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর হবে নেতিবাচক কারণ, পাটের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।
তাইতো সারাদেশে পাট আবাদে বিমুখ হচ্ছে কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বেশি এবং কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় দিনদিন আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। চাষিরা জানালেন, গত বছর ২ হাজার ৮শ’ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা দরে। গেল বছরের তুলনায় এবছর পাটের দাম কমেছে অর্ধেক। গুনতে হচ্ছে লোকসান। এদিকে পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারছেনা কৃষকরা। অপরিষ্কার অল্প পানিতে পাট জাগ দেয়ায় পাটের রং কালচে হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে কাক্সিক্ষত দাম মিলছে না। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২২-২০২৩) সারা দেশে ৭ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে পাট ও পাটসদৃশ তন্তু মেস্তা চাষ হয়েছে। আর পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৬ বেল (এক বেল=১৮২.২৫ কেজি)। ইতিমধ্যে দেশব্যাপী পাট কাটা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে কোনো কোনো এলাকায় পাট জাগ দেয়া নিয়ে ব্যাহত হচ্ছে কৃষকরা। এ কারণে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পাট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবার দেশি জাতের পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিলো ৩০ হাজার হেক্টরে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৯ দশমিক ২০ বেল হিসাবে দেশি জাতের পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫০ বেল। তোষা পাটের চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরে। আর তোষা পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১১ দশমিক ৭৭ বেল।
এই হিসাবে ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার ৯৩৪ বেল পাট উৎপাদন হবে। পাটসদৃশ তন্তু মেস্তা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় ২০ হাজার ১৮০ হেক্টরে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৮ দশমিক ১০ বেল হিসাবে মেস্তার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৮ বেল।
কেনাফ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ২৪ হাজার ৮২০ হেক্টরে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৯ দশমিক ২৩ বেল হিসাবে কেনাফের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১০৫ বেল।
পাট বিশেষজ্ঞরা জানান, চাঁদপুরে একসময় প্রধান অর্থকারী ফসল ছিলো পাট। বর্তমানে উৎপাদন খরচও না উঠায় পাঠ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা। তারা জানালেন, গেল বছর প্রতি মণ পাটের দাম ছিল ২৮শ’ থেকে ৩ হাজার টাকা।
এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা দরে। চলতি বছর জেলায় পাটের আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ২শ’ ১০ হেক্টর জমিতে। মণ প্রতি আবাদে খরচ হয়েছে ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা। এতে ব্যাপক লোকসানের শঙ্কা করছে চাষিরা।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন কৃষি কর্মকর্তা জানালেন, পাটের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন হয়েছে। আগামী বছর থেকে নতুন জাত আবাদের মাধ্যমে কৃষকরা দ্বিগুণ ফলন পাবে ও অধিক লাভবান হবে।
এদিকে, রাজবাড়ীতে পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারছেনা কৃষকরা। অধিকাংশ ক্ষেতেই পাট রোদে পুড়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে অপরিষ্কার অল্প পানিতে জাগ দেয়ায় পাটের রং কালচে হয়ে যাচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে না কাক্সিক্ষত দাম।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন শেখ জানিয়েছেন, অধিকাংশ পাটের জমিতে আমনের আবাদ হয়। তাই পাট দ্রুত কাটতে ও জাগ দিতে হবে। না হলে আমনের আবাদ ব্যাহত হতে পারে। জেলায় এবছর ৪৯ হাজার ১২২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় এক হাজার হেক্টর বেশি।
গত কয়েক বছর পাটের দাম ভালো পাওয়ায় চাষিরা এবার পাট চাষে বেশি ঝুঁকেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বৈরী আবহাওয়া। সাধারণত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে পাট চাষ হয়ে থাকে এবং জাগ দেয়াও পানির উপর নির্ভর। পাট চাষের সময় বৃষ্টি টান দেয়ায় চাষিরা সেচ দিয়ে পাট চাষ করেছেন।
এতে তাদের চাষের খরচ বেশি হয়েছে । আবার অনেক চাষি বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছেন। এতে চাষ নাবি হবে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান। নাবি পাট কেটে রোপা আমন চাষের সময় থাকবে না।
যশোর ও ফরিদপুর অঞ্চলে বৃষ্টির অভাবে পাট চাষ ব্যাহত হয়েছে এবং বর্তমানে পাট জাগ দিতেও হচ্ছে পানির সংকটে। পানির অভাবে অনেক চাষি পাটবীজ বুনতে পারেননি। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার ব্রহ্মপুর গ্রামের চাষি সোহরাব হোসেন জানান, গত বছর এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করেন। ভাল ফলন হওয়ায় এ বছর সেচ দিয়ে দেড় বিঘায় চাষ করেছেন।
ডিজেলের দাম চড়ে যাওয়ায় সেচের খরচ বেশি পড়ছে। গত মৌসুমে ২ হাজার ৯০০ টাকা মন দরে পাট বিক্রি করেছিলেন। বিজুলিয়া গ্রামের চাষি বাচ্চু মোল্লা জানান, গত বছর বৈরী আবহাওয়ায় পাটের ক্ষতি হয়েছিল। এবার পাঁচ বিঘায় পাট চাষ করেছেন। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। তবে বর্তমানে পাট জাগ দেয়া নিয়ে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছেন।
দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা হচ্ছে ফরিদপুর। এই জেলায় এবার ৮৬ হাজার ১৮৫ হেক্টরে পাট চাষের রক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফরিদপুরের উপ-পরিচালক ড. হজরত আলি জানান, ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ জমিতে পাট চাষ হয়ে হয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিরা সেচ দিয়ে পাটবীজ বপন করছেন। কিন্তু বর্তমানে বৃষ্টির অভাবে জাগ দেয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষীরা।
ময়মনসিংহ জেলায়ও পাটের চাষ ভালো হয়। এবার এ জেলায় ৫ হাজার ২৮৮ হেক্টরে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপ-পরিচালক মো. মতিনুজ্জামান জানান, চাষিরা বৃষ্টির জন্য পাটবীজ বপনে বিলম্ব করছেন।
তবে কিছু কিছু চাষি স্বল্প পরিমাণ জমিতে বীজ বপন করেছেন। গত মৌসুমে পাট ওঠার পর প্রতি মণ পাট আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়। এরপর দাম চড়ে ছিল। বর্তমানে ফরিদপুর, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলায় প্রতি মণ পাট ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে বলে শৈলকুপার বাজারের পাট ব্যবসায়ীরা জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা রতন মণ্ডল জানান। কৃষকরা সময় মত পাট কেটে জাগ না দিতে পারলে পাট কেটে রোপা আমন চাষের সময় থাকবে না।
মানিকগঞ্জ জেলা অঞ্চলে বৃষ্টির অভাবে পাট জাগ দেয়া নিয়েও ব্যাহত হচ্ছে কৃষকরা। গত মৌসুমে ২ হাজার ৯০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছিলেন। শানবান্ধা গ্রামের চাষি বাচ্চু মোল্লা বলেন, গত বছর বৈরী আবহাওয়ায় পাটের ক্ষতি হয়েছিল।
এবার পাঁচ বিঘায় পাট চাষ করেছেন। কিন্তু পানির অভাবে উৎপাদিন পাট জাগ দিতে পারছেন না কৃষকরা। জাগ দেয়ার জন্য কৃষকরা বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছেন।
এবি/ওজি

