ই-পেপার বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: সংঘাত নাকি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা?

সাদিয়া সুলতানা রিমি:
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৫৭

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে জটিল এবং অমীমাংসিত সমীকরণটির নাম ‘মধ্যপ্রাচ্য’। গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলটি যেমন দেখেছে তেলের রাজনীতি, তেমনি প্রত্যক্ষ করেছে ক্ষমতার পালাবদল, গৃহযুদ্ধ এবং ধর্মীয় মেরুকরণ। তবে বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে কেবল ‘অস্থিরতা’ বললে ভুল হবে; এটি এখন বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের এক সংকেত। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য এখন কেবল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পরাশক্তিদের শক্তির মহড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত কি কোনো নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি অঞ্চলটি এক অনন্তহীন অরাজকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতার মূলে রয়েছে কয়েক দশক ধরে চলে আসা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংকটের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গাজা উপত্যকায় চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল স্থানীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি এখন লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং সরাসরি ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে যেমন ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই। এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং ধসে পড়ছে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা কূটনীতির কাঠামো।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হলো ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাত। দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ (Shadow War) এখন প্রকাশ্য আক্রমণে রূপ নিয়েছে। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance)—যাতে হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুথি বিদ্রোহীরা অন্তর্ভুক্ত—ইসরায়েল তথা পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দেয়াল তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় এই অক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে মরিয়া। এই দুই শক্তির সরাসরি সংঘর্ষ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক সুতোর ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এই অঞ্চলে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

আরব বিশ্বের অবস্থান ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডের ভবিষ্যৎ

একটা সময় ছিল যখন আরব বিশ্ব বলতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে একাট্টা এক জোটকে বোঝাত। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটা বদলে গেছে। ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো দেশগুলো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি আরবও এই পথেই হাঁটছিল, তবে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করে দিয়েছে। বর্তমানে আরব দেশগুলো এক চরম দোটানায় রয়েছে। একদিকে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা ও পশ্চিমা বিনিয়োগ প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের ভেতরে এবং মুসলিম বিশ্বে জনমতের চাপে তারা ফিলিস্তিন ইস্যু এড়িয়ে যেতে পারছে না। ফলে আরব বিশ্বের এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্য আর কেবল আমেরিকার একক প্রভাব বলয় নয়। যদিও আমেরিকা এখনও এই অঞ্চলের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক অংশীদার, কিন্তু চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। চীন যখন ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতা করে, তখন বিশ্ববাসী এক নতুন নেতৃত্বের স্বাদ পায়। আবার সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার ভূমিকা প্রমাণ করে যে, মস্কোর সমর্থন ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো সমাধান সম্ভব নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার মনোযোগ অন্যদিকে থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থ বিন্দুমাত্র কমেনি। এই তিন পরাশক্তির পারস্পরিক প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিশাল দাবার বোর্ডে পরিণত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য মানেই তেলের রাজনীতি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ অনস্বীকার্য। বর্তমান অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) ব্যাহত হচ্ছে। সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্তের লড়াই নয়, এটি এখন প্রতিটি দেশের মানুষের পকেটে এবং রান্নাঘরে প্রভাব ফেলছে।

এই দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার সবচেয়ে করুণ চিত্রটি ফুটে ওঠে শরণার্থী শিবিরে। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং গাজার লাখ লাখ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত। এক প্রজন্মের পর এক প্রজন্ম যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়ে বড় হচ্ছে। শিক্ষার অভাব, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসার দুষ্প্রাপ্যতা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মানবিক বিপর্যয় কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়, এটি ইউরোপসহ সারা বিশ্বের জন্য একটি বিশাল শরণার্থী সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।

‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনার টেবিলে না বসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি কেবল সুদূরপরাহত স্বপ্নই থেকে যাবে। তবে আশার আলো এই যে, তরুণ প্রজন্ম এখন যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তির দিকে বেশি আগ্রহী। সৌদি ভিশন ২০৩০ বা আমিরাতের মহাকাশ গবেষণা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সমীকরণটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির নেই। এটি যেমন ধ্বংসাত্মক সংঘাতের হাতছানি দিচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার এক চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, পরাশক্তিদের স্বার্থত্যাগ এবং একটি ন্যায়সংগত রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই অস্থিরতা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। পৃথিবী এখন তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এটি কি আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়ে সারা বিশ্বকে ছাই করে দেবে, নাকি ধংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন এক শান্তির বার্তা নিয়ে জেগে উঠবে? সময় এবং ইতিহাসই কেবল এর উত্তর দিতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আমার বার্তা/সাদিয়া সুলতানা রিমি/এমই

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, গণভোট এবং জুলাই সনদের ধারণ সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে এআই ড্রোন ব্যবহার করুন

বাংলাদেশের সামনে আর সময় নেই। নির্বাচন যত এগোচ্ছে, তত স্পষ্ট হচ্ছে যে প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা

স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স কি টেকসই?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, গ্রামীণ ভোগব্যয়

দুর্নীতিবাজকে ভোট দিয়ে সুশাসনের স্বপ্ন দেখাই আত্মপ্রবঞ্চনা

দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে নির্বাচিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ভালো থাকা যাবে, শান্তিতে থাকা
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি বেকার যুবকের চাকরির ব্যবস্থা করবে বিএনপি

জামায়াত নেতার অর্ডারে অবৈধভাবে তৈরি করা হয় ভোটের সিল

কুড়িগ্রামকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে পরিণত করা হবে: শফিকুর রহমান

ইসলামী আন্দোলনের ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ ঘোষণা

১২ ফেব্রুয়ারির আগে শেরপুর-৩ আসনে নতুন তফসিল নয়: ইসি মাছউদ

৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন শফিকুর রহমান

নির্বাচনে ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

নারীদের পেছনে রেখে দেশ এগোতে পারে না: তারেক রহমান

লক্ষ্মীপুরে অবৈধ ভোটের সিল জব্দ, দুইজনের নামে পুলিশের মামলা

নির্বাচনে ভোট দিতে চান ৯০ শতাংশ ভোটার: সিআরএফের জরিপ

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: সংঘাত নাকি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা?

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির আভাস পাচ্ছি: মাহদী আমিন

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

রাজনীতি করেন, কিন্তু মিথ্যা বলবেন না: জামায়াতের উদ্দেশে ফখরুল

দেশে আর কোনো জমিদারি চলবে না, দেশ হবে জনগণের: জামায়াত আমির

জনগণের রায়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ চলবে: তারেক রহমান

এই জালেমদের দল বলছে তারা সৎ শাসন করবে: তারেক রহমান

২০ বছর পর বরিশালে জনসভা মঞ্চে তারেক রহমান

নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

সারাদেশে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ১০৫১ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ