ই-পেপার শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

ঢাকার ফুটপাথ পথশিশুদের ঘর ও আশ্রয়স্থল

জামিল হোসেন
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:১৪
আপডেট  : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:৫০

ঢাকার মতো একটি শহর যেখানে উন্নয়ন ও প্রগতির ছোঁয়া অথচ সেই শহরের ফুটপাথগুলোতে লুকিয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতা। এই ফুটপাথগুলোই অনেক পথশিশুর জন্য ঘর, আশ্রয়স্থল এবং জীবনের প্রতিদিনের লড়াইয়ের মঞ্চ। তারা রাস্তায় বাস করে, রাস্তায় খায়, রাস্তায় ঘুমায় এবং রাস্তায় বড় হয়। কিন্তু এই কঠিন জীবনযাত্রার পেছনে লুকিয়ে আছে তাদের অকথ্য মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, যা বেশিরভাগ সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস

বেশিরভাগ পথশিশুই জন্ম নিয়েছে দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায়। কেউ বাবা-মাকে হারিয়ে, কেউবা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে, আবার কেউ গ্রাম থেকে শহরে এসে হারিয়ে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে ফুটপাথে। এদের কারও কারও পরিবার আছে, কিন্তু দারিদ্র্যের চাপে তারা বাধ্য হয় রাস্তায় জীবনযাপন করতে। সাধারণত সব শিশুই এ বয়সে পরিবারের অটুট বন্ধনে থেকে মা-বাবার নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতার জন্য সবাই মা-বাবার ছায়ার নিচে সুন্দর একটি জীবন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। যে বয়সে তাদের কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তারা তাদের কাঁধে একটি ধুলোমাখা বস্তা ঝুলিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। যে বয়সে তাদের পরিবার আর বন্ধুদের সাথে আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সে তারা পথে পথে, খোলা আকাশের নিচে প্রতিনিয়ত বাঁচার লড়াই করে। তারা বেড়ে উঠে নানা অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। এই বয়সে ওদের পরিচয় হয় পথশিশু হিসবে। অধিকাংশ পথশিশুদের নিজস্ব কোনো পরিবার নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা পরিবার থেকে পালানো কিংবা মা-বাবা তাড়ানোও হয়। অনেকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবটাই রাস্তায়। সাধারণত বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ স্থান বিশেষ করে রেল স্টেশন, বাস স্টপেজ, লঞ্চ টার্মিনাল ইত্যাদি জায়গায় পথশিশুদের দেখা যায়। পথশিশুরা ঠিকমতো দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারে না। কোনো সময় এক বেলা জুটলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে অভ্যস্ত এসব শিশুদেরকে ক্ষুধার তাড়নায় ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার কুড়িয়ে খেতেও দেখা যায়।

পরিবারের স্নেহবঞ্চিত এসব শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। খাবারের জন্য কুকুরের সঙ্গে লড়াই করা, ফুটপাথে ঘুমানো, আর বৃষ্টি হলে দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়া। এসবই তাদের নিত্যদিনের ঘটনা।

পথশিশুদের জীবন : সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

ঢাকার ফুটপাথগুলোতে বসবাসকারী পথশিশুদের জীবন প্রতিদিনের সংগ্রামের একটি প্রতিচ্ছবি। পথশিশুদের বেশিরভাগই সারাদিন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে, কেউবা ভিক্ষার আশ্রয় নেয়। কিছু শিশু ডাস্টবিন থেকে খাবার খুঁজে নেয়, কেউ কেউ ময়লা কুড়িয়ে বিক্রি করে সামান্য আয় করে। তারা পরিবার, শিক্ষা এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের জীবনযাত্রা অস্থির, অনিশ্চিত এবং প্রায়ই সহিংসতার মুখোমুখি। অনেক পথশিশুই নানা ধরনের শোষণ, নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হয়। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত, পাচারের শিকার কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এই সবকিছুই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শিক্ষার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

ফার্মগেটের ফুটপাতে হোটেলের ফেলে দেওয়া খাবার খাচ্ছে দুই পথশিশু। দিনপ্রতি মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে তারা কাজ করে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা শ্রমিকের বদলি হিসেবে। ছবি: সংগৃহীত।

পথশিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট : উপেক্ষিত সমস্যা

পথশিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট একটি গুরুতর সমস্যা, যা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। এতে করে তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। অনিরাপদ পানি পান করা, অপরিচ্ছন্ন খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে তারা নানা ধরনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার মধ্যে বসবাস করে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক বৈষম্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করে। অপুষ্টি, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, এমনকি টিবি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি।

এছাড়া, অনেক পথশিশুই বিষন্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগছে। কিন্তু তাদের এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, যা তাদের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অভাব

পথশিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট স্কুল, নেই কোনো বিনামূল্যের শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা না থাকায় তারা ভবিষ্যতে কোনো ভালো কাজের সুযোগও পায় না, ফলে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে।

শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্যসেবা থেকেও তারা বঞ্চিত। অসুস্থ হলে ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। অপুষ্টি, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগে আক্রান্ত হয় তারা। অপরিষ্কার পানি, অনিরাপদ খাদ্য, এবং অনিশ্চিত আশ্রয় তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।

পথশিশুদের সমস্যা সমাধানে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হতে পারে

সরকার ও সমাজের উচিত পথশিশুদের নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসা উচিত। প্রথমত, তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য করতে হবে এবং পথশিশুদের জন্য বিশেষায়িত কাউন্সেলিং ও থেরাপির ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে পথশিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পথশিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পথশিশুদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা

ঢাকার ফুটপাথগুলোতে বসবাসকারী পথশিশুদের জীবন কঠিন, কিন্তু তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করে তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়। সমাজ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন এই সমস্যা সমাধানের জন্য। পথশিশুদের কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাদেরকে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সমাজের মূলধারার মূল্যবোধ তৈরিতে রাষ্ট্রকে প্রধান কাজ করতে হবে। তাদের হাসি ফোটানোই হবে আমাদের সত্যিকারের উন্নয়নের মাপকাঠি।

লেখক : জামিল হোসেন, অনলাইন নিউজ এডিটর, দৈনিক আমার বার্তা, ঢাকা।

আমার বার্তা/জেএইচ

অর্থ পাচারসহ আর্থিক অপরাধ দমনে সিঙ্গাপুর কার্যকর ও সফলঃ এফএটিএফ

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বিষয়ক বৈশ্বিক নজরদারি সংস্থা "ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক

আধুনিক কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়েই টেকসই সমৃদ্ধির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া

বাংলাদেশে রেলক্রসিং, লঞ্চ ও ফেরি দুর্ঘটনা: এক চলমান জাতীয় ট্র্যাজেডি, কিছু সুপারিশ

বাংলাদেশ গত দুই দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন

ভ্যাট সংস্কার এখন সময়ের দাবি: ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেট কতটা প্রস্তুত

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরমুখী সময়ে অবস্থান করছে। এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়ায় আমরা যেমন দ্রুত এগিয়ে
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পরিচয় মিলেছে সীমান্তে উদ্ধার হওয়া সেই অজ্ঞাত মরদেহের

ইরান সংঘাতে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে প্রায় ১৫০০ জাহাজ: আইএমও

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা বিলুপ্ত ঘোষণা, মমতার ১৫ বছরের শাসনের অবসান

মাইলফলক গোলে দলকে বড় জয় উপহার রোনালদোর

মিরপুরে রাওয়ালপিন্ডির সুখস্মৃতি ফেরানোর লড়াই বাংলাদেশের

ট্রাম্পের ১০ শতাংশ ‘বেইসলাইন শুল্ক’ অবৈধ: মার্কিন আদালত

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বাড়বে গরম

২৩ দিন পর আবারও ইস্টার্ন রিফাইনারীতে উৎপাদন শুরু

ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আলোচনায় মাদক ও সন্ত্রাস দমন

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

ইরানে হামলার পর ট্রাম্প বললেন যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল

দে‌শের পথে বৃষ্টির মরদেহ, ঢাকায় পৌঁছাবে শনিবার

৮ মে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা

ঈদুল আজহায় সাত দিনের ছুটি ঘোষণা

অনেক সরকারি কোম্পানি বেসরকারি মালিকানায় যাবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

ভারত সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী, ওদের কথা কেউ বিশ্বাস করে না: পাকিস্তান সেনাবাহিনী

সিঙ্গাপুর থেকে আসছে ৩ কার্গো এলএনজি, ব্যয় ২১৮৬ কোটি টাকা

ঈদে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ সজাগ থাকার নির্দেশ

পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে জার্মানির সহযোগিতা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিজেপির জেতা ১০৫ আসনেই ভোট ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটার বেশি