
বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে, প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অধিকার রয়েছে ইসরায়েলের। এমন মন্তব্য করেছেন পশ্চিম জেরুজালেমে, অর্থাৎ ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক হাকাবি। সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আরব বিশ্বের দেশগুলো হাকাবির এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাকাবি আগে মার্কিন অঙ্গরাজ্য আরকানসাসের গভর্নর ছিলেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ইসরায়েলে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। ৭০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ও কূটনীতিক একজন ব্যাপ্টিস্ট ধর্মযাজক। তিনি নিজেকে খ্রিষ্টান জায়নবাদী বলেও পরিচয় দেন।
ফের বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, এবার নেতৃত্বে ছাত্ররাফের বিক্ষোভে উত্তাল ইরান, এবার নেতৃত্বে ছাত্ররা
শুক্রবার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে হাকাবি কার্লসনকে বলেন, ‘জায়নবাদী বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝায়, যিনি বিশ্বাস করেন—ইহুদিদের একটি নিজস্ব মাতৃভূমি থাকার অধিকার আছে, যেখানে তারা নিরাপদে ও সুরক্ষিতভাবে থাকতে পারে। তারা বিশ্বাস করেন, ইহুদিদের ইসরায়েলে বসবাসের অধিকার রয়েছে।’
হাকাবি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার এসেছে বাইবেল থেকে। এটি সেই ভূমি, যা ঈশ্বর ইব্রাহিমের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচিত জাতিকে দিয়েছিলেন।’ জবাবে কার্লসন বলেন, ‘আদিপুস্তক বা বুক অব জেনেসিস অনুযায়ী ঈশ্বর হিব্রু পিতামহকে যে ভূখণ্ড দেওয়ার কথা বলেছেন, তা ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী থেকে নীলনদ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এরপর মাইক হাকাবি বলেন, ‘এর মানে হচ্ছে প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য। অর্থাৎ লেভান্ত অঞ্চল। এতে ইসরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবানন পড়বে। পাশাপাশি সৌদি আরব ও ইরাকের বড় অংশও এর মধ্যে পড়বে।’ কার্লসন প্রশ্ন করেন, এর মানে কি ইসরায়েলের ওই ভূমির ওপর অধিকার আছে? কার্লসন আরও বলেন, ‘আপনি তো জেনেসিসের কথা বলছেন। আপনি বলছেন, সেটাই আসল দলিল?’ জবাবে হাকাবি বলেন, ‘তারা সব নিয়ে নিলেও সমস্যা হতো না। কিন্তু আমরা আজ সেটি নিয়ে কথা বলছি না।’
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে ইসরায়েল দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ করছে। গাজায় চলমান যুদ্ধে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি গত আড়াই বছরে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে, লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশ দখল করেছে এবং ইয়েমেনেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
ইরানে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের টার্গেট করে মার্কিন হামলা হতে পারেইরানে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের টার্গেট করে মার্কিন হামলা হতে পারে
এদিকে হাকাবির এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো। ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের জোট আরব লিগ এই মন্তব্যকে ‘চরমপন্থী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, এই বক্তব্য কূটনীতির মৌলিক নীতি ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরব লিগের মহাসচিব আহমেদ আব্দুল ঘাইতের মুখপাত্র গামাল রুশদি বলেন, ‘এ ধরনের চরমপন্থী ও ভিত্তিহীন বক্তব্য শুধু উত্তেজনা বাড়ায়। ধর্মীয় ও জাতীয় আবেগকে উসকে দেয়। এমন সময় এই মন্তব্য এসেছে, যখন রাষ্ট্রগুলো গাজা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে শান্তি বোর্ডের কাঠামোর অধীনে বৈঠক করছে।’
৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) একই ধরনের বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, এ ধরনের ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ মন্তব্য চরমপন্থী মতাদর্শকে উসকে দেয়। এতে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংযুক্তি আরোপে উৎসাহিত হতে পারে। জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাকাবির বক্তব্যকে ‘অযৌক্তিক ও উসকানিমূলক’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এই মন্তব্য কূটনৈতিক রীতি ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন।
মিসর বলেছে, এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতির ‘স্পষ্ট বিচ্যুতি।’ সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও মার্কিন দূতের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এসব বক্তব্য আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজার কিছু অংশে, পাশাপাশি দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার কিছু এলাকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিম তীরের বড় অংশকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধের পর এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মুসলিম দেশগুলো এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট ও দৃঢ় পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

