
একদিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চারজন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম)-কে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ডিএসইর ইতিহাসে এর আগে কখনো এভাবে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। হুট করে চাকরিচ্যুত করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এসব কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ডিএসইর ঊর্ধ্বতনরা বলছেন, চাকরিচ্যুত করার বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। ডিএসইকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি রিসোর্স অপটিমাইজেশন পরিকল্পনার অংশ।
ডিএসইর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেনারেল অ্যাডমিন বিভাগের ডিজিএম মো. আব্দুল লতিফ ও হোসনে আরা পারভীন, আইসিটি বিভাগের জিডিএম শাহিন সারওয়ার এবং ইনভেস্টর প্রকেক্টশন ফান্ডের সমন্বয়ক ডিজিএম আব্দুর রাজ্জককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি দুজন সিনিয়র ম্যানেজার এবং নীচের পদে আরও দুজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, এসব কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত করার পাশাপাশি আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে বর্তমানে ডিএসইর কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি হারানোর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
চাকরিচ্যুত করা একজন ডিজিএমকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসইর জনবল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তাকে তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় তার পদটি আর প্রয়োজন নেই।
এতে বলা হয়েছে, চাকরি অবসানের পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে তিনি ১২০ দিনের সমপরিমাণ মোট বেতন নোটিশের পরিবর্তে পাবেন। এছাড়া চলতি মাসের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য অর্থ, গ্র্যাচুইটি সুবিধা, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ ও ডব্লিউডব্লিউএফ) থেকে প্রাপ্য অর্থ, অব্যবহৃত বার্ষিক ছুটির নগদায়নসহ ডিএসইর নীতিমালা অনুযায়ী অন্যান্য পাওনাও পরিশোধ করা হবে।
পাশাপাশি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে তাকে অতিরিক্ত দুই মাসের সমপরিমাণ মোট বেতন দেওয়া হবে। তবে এ অর্থ সম্পূর্ণভাবে ডিএসইর বিবেচনাধীন সুবিধা এবং এটি ভবিষ্যতে কোনো আইনি অধিকার বা নজির সৃষ্টি করবে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত পাওনার হিসাব প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দেওয়া হবে। হিসাব পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে কোনো আপত্তি না জানালে তা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। প্রযোজ্য কর, অগ্রিম, ঋণ বা অন্য কোনো দায় সমন্বয়ের পর চাকরি অবসানের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে চেকের মাধ্যমে সব অর্থ পরিশোধ করা হবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, চাকরি অবসানের দিনই তাকে পরিচয়পত্র, ব্যবসায়িক কার্ড, নথিপত্রসহ প্রতিষ্ঠানের সব সম্পদ ও গোপনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। চাকরি অবসানের পরও প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ না করার বাধ্যবাধকতা বহাল থাকবে।
ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, ডিএসইর ইতিহাসে এভাবে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করার নজির নেই। হুট করে ডেকে নিয়ে চাকরিচ্যুত করার চিঠি ধরি দেওয়া হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ কর্মকর্তা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। কখন কার চাকরি চলে যায়, সবাই এখন সেই আতঙ্কে ভুগছেন।
যোগাযোগ করা হলে চাকরিচ্যুত হওয়া মো. আব্দুল লতিফ বলেন, আমাকে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে চিঠিতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তারা তাদের পছন্দ মতো ম্যানেজমেন্টের লোকজন দিয়ে সাজাতে চায়। যারা তাদের কথা মতো চলবে তাদেরকে শুধু রাখবে। এখন এটা নিয়ে তো আমার কিছু বলার নাই। আমাকে যখন যে দায়িত্ব দেয় আমি আইনের মধ্যে থেকে সেই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, আমি ২১ বছর ধরে ডিএসইতে চাকরি করছি। আমি যখন জয়েন করি, তখন ছিলাম সেকেন্ড পজিশনে। এতদিন সার্ভিস দেওয়ার পর যদি এই ফিডব্যাক পাই, তাহলে তো কিছু বলার নেই।
আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা হোসনে আরা পারভীন বলেন, আমাদের চাকরির বিধি অনুযায়ী ৬৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করতে পারবো। এভাবে আমাদের চাকরিচ্যুত করার কোনো নিয়ম নেই। কোনো ধরনের নোটিশ না দিয়েই হুট করে চাকরি না থাকার চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩২ বছর ধরে আমি ডিএসইতে চাকরি করছি। আশ্চর্যের বিষয় চিঠি দেওয়ার আগেই আমার কম্পিউটারসহ সবকিছুই নিয়ে নিয়েছে।
চাকরিচ্যুত আরেক ডিজিএম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিএসইতি প্রায় ৩২ বছর চাকরি করছি। ডিএসইতে আগে কখনো এভাবে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। হুট করে ডেকে নিয়ে গিয়ে চিঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কী কারণে চাকরিচ্যুত করা হলো— চিঠিতে তা উল্লেখ করা হয়েছে? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা আসলে কোনো কারণ না। বলা হয়েছে— আপনাকে যে পদের জন্য নেওয়া হয়েছিল, সেই পদ এখন আর নেই। আসলে এটা কোনো কারণ না। তারা তাদের পছন্দের লোক রাখার জন্য এভাবে আমাদের চাকরিচ্যুত করেছে।
যোগাযোগ করা হলে ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, চাকরিচ্যুত করার বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। বরং ডিএসইকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করতে দীর্ঘমেয়াদি রিসোর্স অপটিমাইজেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিএসইকে আরও দক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘদিনের জনবল কাঠামো পর্যালোচনা করেছি। বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্যায়নের পর বোর্ড সামগ্রিক নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এরপর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, এইচআর বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী পদগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি আইন, বিধিবিধান এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব পদ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নয় বলে বিবেচিত হয়েছে, সেসব পদেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বা ব্যক্তিগত কারণে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ।
কতজন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে ডিএসইর চেয়ারম্যান বলেন, নির্দিষ্ট সংখ্যাটি ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি এইচআর কমিটি দেখভাল করেছে। বোর্ড কেবল সামগ্রিক নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তাই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমার কাছে নেই।
ভবিষ্যতে এসব পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রিসোর্স অপটিমাইজেশনের অংশ হিসেবে যেসব পদ অপ্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়েছে, সেগুলোই বিলুপ্ত করা হয়েছে। পদগুলোর প্রয়োজন থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না। তাই আগামীতে এসব পদে নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা নেই। সূত্র : জাগো নিউজ
আমার বার্তা/এমই

