
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ৪০ শতাংশ কমেছে। দেশে চাল উৎপাদনেও ঘাটতি নেই। তারপরও কেন দাম বাড়ে— এ প্রশ্ন রেখে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, এ ক্ষেত্রে চালের উৎপাদন খরচ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বড় কারণ।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ধানমন্ডিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক মিডিয়া বিফ্রিংয়ে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন।
এ সময়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির গবেষণা প্রবদ্ধ উপস্থাপনকালে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৩ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনও চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কমছে, তবে কমার হার ধীর। লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমে এসেছে। তবে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ। সুতরাং খাদ্যের মূল্য কিছুটা কমলেও অন্যান্য পণ্যের দাম বেশি।
তিনি বলেন, খাদ্যের দাম কেন কমছে না? যেমন: চালের মূল্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তথ্যে পাওয়া যায় চালের চাহিদা ৩১ মিলিয়ন মেট্রিক, আর উৎপাদন ৪৪ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ চালের উৎপাদনে ঘাটতি নেই। তারপরও কেন দাম বাড়ে। এ ক্ষেত্রে চালের উৎপাদন খরচ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বড় কারণ হিসাবে দেখতে পাচ্ছি। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ৪০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু আমাদের দেশে কমছে না। চিনি ও তেলের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আমাদের দেশে কমছে না।
সামনে নির্বাচন, অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিও মন্থর এই অবস্থায় রাজস্ব লক্ষমাত্রা বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্ন রেখে সিপিডির ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনমাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৬.৭ শতাংশ হলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যতটুকু জানতে পেরেছি নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১৫.০২ শতাংশ। এনবিআরকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, তাহলে বাকি সময়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় খুবই কঠিন হবে। অন্যদিকে সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে মূল বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা থাকে সেটা অর্জন করতেই এনবিআরকে হিমশিম খেতে হয়। সামনে নির্বাচন, অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিও মন্থর। এই অবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন রয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে সরকারি ব্যয়ে দেখতে পাই সরকারি ব্যয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিন্ম। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার সাড়ে ১১ শতাংশ। বড় বড় মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার অনেক কম। যেমন- সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ইত্যাদি। আবার বাজেট ঘাটতি নিয়ে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে অনুদান বাদে বাজেটে উদ্বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। ওই সময়ে বাজেট উদ্বৃত্তের পরিমাণ ১২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ধীরগতিই ওই উদ্বৃত্তের প্রধান কারণ।
একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ঋণ গ্রহণ কমেছে। তবে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নির্ভরতা বেড়েছে। প্রথম তিন মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, বিপরীতে আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ব্যাংক খাতকে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। অব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে। জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে মাইনাস ৯ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অব্যাংকিং উৎসগুলোর মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সিপিডি বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং সুদের হারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আর একটি বিষয় হচ্ছে সরকার ৫টি দূর্বল ইসলামী ব্যাংককে একত্রিত করতে গিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা পেইড অব ক্যাপিটাল দিয়েছে। আবার বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি সামনের গ্রীষ্মের লোডশেডিং কমাতে হয়, তাহলে ওই টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর একটি বিষয় হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল চলতি অর্থ বছরে হয়তো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকারকে চাপের মুখে পড়তে হবে।
সুপারিশের ক্ষেত্রে সিপিডি বলছে, রাজস্ব বাড়াতে ডিজিটাল অর্থনীতি, সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর কার্যকর কর আরোপ জরুরি। বাস্তব বাজারমূল্যের ভিত্তিতে সম্পত্তি কর হালনাগাদ করে এনবিআরের সম্পদ করের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে অকার্যকর কর ছাড় ও অব্যাহতিগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে এবং খেয়ালখুশিমতো কর সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক প্রবাহ রোধে নীতিগত ও বাস্তব প্রয়োগ—উভয় পর্যায়ে কর কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
আমার বার্তা/জেএইচ

