
রাজধানীতে বেপরোয়া যাত্রীবাহী বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয়ে এক পা হারিয়েছেন ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক রুদ্র বাংলা পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক মোঃ মতিউর রহমান। বর্তমানে তিনি ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত BIHS General Hospital-এ নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকার মুগদা এলাকায় নিজ বাসা থেকে গত বুধবার ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন মরহুমা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে গুলিস্তান মোড়ে পৌঁছে জানাজাস্থলে যাওয়ার জন্য বাহনের অপেক্ষায় ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ঠিক সে সময় উল্টো দিক থেকে দ্রুতগতির একটি যাত্রীবাহী বাস এসে তাকে চাপা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রত্যক্ষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকারী বাসটি ছিল উৎসব পরিবহন নামের একটি বেসরকারি যাত্রীবাহী বাস। যার নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-৬৬০৯। বাসটি অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের দিকে উঠে যায় এবং সাংবাদিক মোঃ মতিউর রহমানের বাম পায়ের উপর দিয়ে চলে যায়। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার পরপরই বাসে থাকা যাত্রী সাধনা এবং আশপাশের পথচারী ও উৎসুক জনতা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। উপস্থিত লোকজন তাকে চিনতে পেরে দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন এবং একই সঙ্গে ঘাতক বাসটিকেও সনাক্ত করেন। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও স্থানীয়দের সচেতনতায় পরিস্থিতি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়নি।
গুরুতর আহত অবস্থায় সাংবাদিক মতিউর রহমানকে প্রথমে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে জানান, বাম পায়ের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং জীবন রক্ষার্থে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে তাকে ঢাকার মিরপুর-১ এলাকার টেকনিক্যাল মোড় সংলগ্ন BIHS General Hospital-এ ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জানুয়ারি সেখানে সার্জারি বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিশিষ্ট সার্জন ডা. আবু সাঈদ খান-এর নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্রোপচার পরিচালিত হয়। জীবন বাঁচানোর স্বার্থে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সাংবাদিক মতিউর রহমানের বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ কেটে পৃথক করতে হয়।
বর্তমানে তিনি BIHS General Hospital-এর কেবিন সিট নম্বর ৩০৭/১-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলো দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বিবৃতি দিয়েছে। তারা একদিকে যেমন আহত সাংবাদিকের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সার্বিক সহায়তার দাবি জানিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে রাজধানীতে অব্যাহত বাস দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রতিনিয়ত বেপরোয়া বাস চলাচলের কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পেশাজীবী কেউই নিরাপদ নয়। বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সড়কে নৈরাজ্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি দ্রুত দুর্ঘটনাকারী বাসচালক ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে আহত সাংবাদিকের পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রেসক্লাব নেতারা জানান, তারা চিকিৎসা ব্যয়, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিক মোঃ মতিউর রহমান দেশবাসী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পাঠকদের কাছে দোয়া ও প্রার্থনা কামনা করেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সকলের দোয়া ও সহযোগিতায় দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও সাংবাদিকতা পেশায় ও সামাজিক দায়িত্বে ফিরে আসতে চান।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনা জনমনে নতুন করে নিরাপদ সড়কের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাংবাদিক মতিউর রহমানের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

