
ঢাকার শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। নগরীর রাস্তাঘাট, অলিগলি ও বিভিন্ন এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
তবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-২ (মিরপুর) ওয়ার্ড-৭ কার্যালয়ে কর্মরত পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সিআই (সুপারভাইজার) মৃত্যুঞ্জয়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বে থাকা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়, অনুপস্থিত কর্মীদের হাজিরা দেখানো এবং চাকরি হারানোর ভয় দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই মৃত্যুঞ্জয় ২০২৩ সালে আওয়ামী আমলে চাকরিতে যোগদান করেন, আওয়ামী পরিবার সন্তান হওয়ায় খুব সহজেই চাকরিটা আগিয়ে নিয়েছিলেন তখন। সেই থেকেই প্রভাব খাটিয়ে তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তার অধীনে ৬৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। কে কোন এলাকায় কাজ করবেন এবং মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি ও কাজের তদারকির দায়িত্ব সিআই মৃত্যুঞ্জয়ের ওপর।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অভিযোগ, নিয়মিত দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ বা মাসে কয়েকদিন ছুটি দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। কেউ সরাসরি নগদ অর্থ দেন, আবার কেউ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৬৪ জন কর্মীর কাছ থেকে এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে।
১০ কর্মী নিয়মিত ডিউটিতে নেই, অথচ হাজিরা খাতায় পুরো মাসি তাদেরকে উপস্থিত দেখিয়েছেন এই মৃত্যুঞ্জয়!
অনুসন্ধানে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মধ্যে অন্তত ১০ জন নিয়মিত মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মী।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন—করিম, ফিরোজ, সাজু, রফেজা, পিংকি, গাজীর মেয়ে, রবি ও শেফালীসহ আরও দুজন।
অভিযোগ রয়েছে, এদের কেউ গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন, আবার কেউ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। অথচ তাদের নিয়মিত হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মী।
দুই মাস ধরে চালানো অনুসন্ধানে অভিযোগে উল্লেখ করা কয়েকজনকে দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময়ে তাদের নিজ নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পাওয়া গিয়াছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা সিআই মৃত্যুঞ্জয়কে প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা করে দেন। ১০ জনের ক্ষেত্রে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বদলি ডিউটির জন্যও দিতে হয় টাকা
শুধু অনুপস্থিত থাকার বিষয়েই নয়, একজন কর্মীর পরিবর্তে অন্য কেউ বদলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তার কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় গোপন রেখে কথা বলার সময় তারা এসব অভিযোগ করেন। তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা কয়েকজন কর্মীকে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার মৃত্যুঞ্জয়ের
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিআই মৃত্যুঞ্জয়ের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রতিবেদককে উপ-ব্যবস্থাপক মো. বেনজির আহমেদের কক্ষে বসান।
সেখানে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে মো. বেনজির আহমেদ মৃত্যুঞ্জয়ের পক্ষে বক্তব্য দেন। পরে সিআই মৃত্যুঞ্জয় অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের প্রায় ৮০ শতাংশই মিথ্যা এবং তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদকের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অস্বস্তি প্রকাশ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
মৃত্যুঞ্জয়ের বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে বা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সিআই মৃত্যুঞ্জয় কর্মীদের উদ্দেশে বলেন—সাংবাদিকরা কীভাবে এত তথ্য জানতে পেরেছে, তা তিনি খুঁজে বের করবেন এবং যিনি তথ্য দিয়েছেন তাকে চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থা করবেন।
এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি নয়, বরং সিটি কর্পোরেশনের মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও তদারকির বিষয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
মিরপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হাজিরা খাতা, কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টনের তালিকা, ছুটির অনুমোদন, বদলি ডিউটির নথি, সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক লেনদেন এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত সব অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, নথিপত্র ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

