
দেশের নগরজীবনে ভাড়াটিয়া শ্রেণি আজ সবচেয়ে বড় অথচ সবচেয়ে অসুরক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১–এর আলোকে জারিকৃত ১৬ দফা নির্দেশিকা ভাড়াটিয়ার সুরক্ষা এখনো মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কার্যকর প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে এসব আইন ও নির্দেশিকা ভাড়াটিয়ার জীবনে কোনো বাস্তব নিরাপত্তা তৈরি করতে পারেনি।
বর্তমান ব্যবস্থায় ভাড়া নির্ধারণ পুরোপুরি বাড়িওয়ালার ইচ্ছানির্ভর। একই আয়তনের, একই সুবিধাসম্পন্ন ফ্ল্যাটের ভাড়া একই এলাকায় হলেও ভয়াবহ বৈষম্য চোখে পড়ে। কোথাও ১৫ হাজার টাকা, আবার কোথাও সেই একই ফ্ল্যাটের ভাড়া ৫০ হাজার টাকারও বেশি। কোনো বৈজ্ঞানিক, এলাকা-ভিত্তিক বা স্বচ্ছ মানদণ্ড না থাকায় ভাড়াটিয়া থাকে চরম অসহায় অবস্থানে—দর কষাকষির সুযোগ নেই, আপত্তির অধিকার নেই।
এই অসাম্য শুধু ভাড়ার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়। অগ্রিম ভাড়া, চুক্তিপত্র, ভাড়া বৃদ্ধির সময়সীমা—সবকিছুই অধিকাংশ ক্ষেত্রে একতরফা। কোথাও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, কোথাও আবার কাগজে-কলমে ভাড়া কম দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি “এই মাসে ভাড়াটিয়া ছিল না”—এই মিথ্যা তথ্য দেখিয়ে রাষ্ট্রকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে রাজস্ব থেকে। এতে ভাড়াটিয়ার অধিকার যেমন লঙ্ঘিত হচ্ছে, তেমনি দুর্বল হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা।
এই প্রেক্ষাপটে সময় এসেছে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার। শহরের প্রতিটি থানা বা জোনভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নাগরিক সেবা ও পরিবেশগত মান বিবেচনায় প্রতি স্কয়ার ফিট ভাড়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে ফ্ল্যাটের আয়তন ও অবকাঠামো ভিডিও ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস গড়ে উঠবে। জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সেই ডেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ সম্ভব।
ভাড়া লেনদেনের ক্ষেত্রেও সংস্কার জরুরি। পনেরো শত থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত বাসা, দোকান, অফিস বা শিল্পকারখানার ভাড়া নগদ নয়—ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক লেনদেন নিশ্চিত করা হলে কালো টাকা, কর ফাঁকি এবং ভাড়াটিয়াকে হয়রানির সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে।
এক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। ভাড়াটিয়াকে কেবল বাসিন্দা নয়, একজন ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে—নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় হচ্ছে কি না, ভাড়া গোপন করা হচ্ছে কি না, কিংবা আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ভাড়াটিয়াকে হয়রানি করা হচ্ছে কি না।
আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগে দৃঢ়তা থাকে। ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন যদি কেবল নির্দেশিকা ও নোটিশ বোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ভাড়াটিয়ার দুর্ভোগ কমবে না। স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
দেশের নগরজীবনে ভাড়াটিয়া শ্রেণি আজ সবচেয়ে বৃহৎ অথচ সবচেয়ে অসুরক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি। ভাড়াটিয়া কোনো দয়ার পাত্র নয়; ন্যায্যতার অধিকারী নাগরিক। সে আইনসম্মত ন্যায্যতার দাবিদার।এই সত্যটি রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের উপলব্ধি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থেই ভাড়া বাজারকে শৃঙ্খলার আওতায় আনা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি
আমার বার্তা/জেএইচ

