
ভালোবাসা মানুষের সম্পর্ক দৃঢ় করে, মানুষকে আবেগী করে তুলে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। বর্তমানে আমাদের তরুণদের কাছে প্রেম মানেই সিনেমা বা উপন্যাসের রোমাঞ্চকর গল্প। কিন্তু বাস্তব জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক ভালোবাসার উদাহরণ রয়েছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর জীবনে। স্ত্রীদের প্রতি তার আচরণ, সম্মান ও মমতা আজও মুসলিম দাম্পত্য জীবনের জন্য আদর্শ।
নবীজি (সা.) শুধু নারীর প্রতি সম্মান ও সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেননি, নিজে তা বাস্তবে পালন করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।
স্ত্রীদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসা ও যত্নের বহিঃপ্রকাশের বিষয়টি উঠে এসেছে একাধিক হাদিসে। স্ত্রীর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের ১০টি হাদিস তুলে ধরা হলো এখানে—
১. খোলামেলাভাবে ভালোবাসার প্রকাশ
হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার কথা সাহাবিদের কাছেও গোপন ছিল না। একবার আমর ইবনে আস (রা.) জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আয়েশা (রা.), আর পুরুষদের মধ্যে তার বাবা আবু বকর (রা.)।
আয়েশা (রা.) যে পাত্রে পানি পান করতেন, নবীজি (সা.) সেই পাত্রের একই জায়গায় মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন।এটিও ভালোবাসার এক নীরব প্রকাশ।
২. নিজ হাতে স্ত্রীকে খাইয়ে দিতেন
স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেওয়া সুন্নত। মহানবী (সা.) নিজে এই সুন্নতটি করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্ত্রীর মুখে এক লোকমা তুলে দিলে তাতে রয়েছে সওয়াব।
৩. স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা
নবুয়ত ও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো বিশাল দায়িত্বের মাঝেও মহানবী (সা.) স্ত্রীর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। একবার আয়েশা (রা.) তাকে হারিয়েও যান। পরেরবা দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনি আয়েশা (রা.)-কে হারান
৪. স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিপাটিভাবে উপস্থাপন
ঘরে প্রবেশের পর তার প্রথম কাজ ছিল মিসওয়াক করা। অর্থাৎ দাঁত পরিষ্কার করা। স্ত্রীর সামনে নিজেকে সুন্দর ও পরিপাটিভাবে উপস্থাপনের জন্য তার এই কাজটি আমাদের সবার জন্য অনুসরণীয়।
৫. স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত
আয়েশা (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে কোরআন পড়তেন নবীজি (সা.)। এই কাজটি দাম্পত্য জীবনের গভীর ঘনিষ্ঠতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
৬. একই পাত্রে গোসল
মহানবী (সা.) ও তার স্ত্রী একসঙ্গে একই পাত্রের পানি দিয়ে গোসল করতেন।
৭. স্ত্রীর আগ্রহকে গুরুত্ব দিতেন
মসজিদের আঙিনায় ইথিওপীয় যুবকদের খেলা দেখার ইচ্ছা হলে আয়েশা (রা.)-কে নিজের চাদর দিয়ে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তার খেলা দেখার আগ্রহ মিটেছে।
৮. স্ত্রীর বন্ধুদেরও ভালোবাসতেন
মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি তার বান্ধবীদের জন্য নিয়মিত উপহার পাঠাতেন। এ কারণে আয়েশা (রা.) কখনো কখনো ঈর্ষান্বিতও হতেন।
৯. ঘরের কাজে সাহায্য
মহানবী (সা.) নিজ হাতে কাপড় সেলাই করতেন, ঘরের কাজ করতেন। নামাজের সময় হলে মসজিদে চলে যেতেন।
১০. স্ত্রীকে সুন্দর নামে ডাকা
নবীজি (সা.) আয়েশা (রা.)-কে আদর করে ‘হুমাইরা’ নামে ডাকতেন। সুন্দর নামে ডাকা যে ভালোবাসারই প্রকাশ, তা তিনি কাজে প্রমাণ করেছেন।
দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়; বরং সম্মান, সময় দেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া আর ছোট ছোট যত্নের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা। নবীজি (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, রোমান্টিকতা মানে বিলাসিতা নয়, বরং মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে ভালোবাসাকে জিইয়ে রাখা।
বর্তমানে দাম্পত্য জীবন সুখী করতে মহানবী (সা.)-এর দেখানো শিক্ষাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
আমার বার্তা/জেএইচ

