ই-পেপার বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

অচল চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচান, অর্থনীতি রক্ষা করুন

সাদিয়া সুলতানা রিমি:
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:২৫

দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত অচল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক–কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে থেমে গেছে জাহাজ চলাচল, বন্ধ রয়েছে পণ্য খালাস কার্যক্রম, কনটেইনারে উপচে পড়ছে ইয়ার্ড। দেশের অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং তা গভীর সংকেত বহন করছে।

এই অচলাবস্থা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি একদিনে তৈরি হয়নি। বরং এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়া, প্রশাসনিক জেদ, অংশীজনদের সঙ্গে সময়োচিত ও অর্থবহ সংলাপের অভাব এবং আস্থাহীনতার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি। চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে যে সংকট আজ দৃশ্যমান, তা মূলত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও শ্রমিক অসন্তোষের সংঘাতে রূপ নিয়েছে যার খেসারত দিচ্ছে পুরো দেশ।

চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি অবকাঠামো বা প্রশাসনিক ইউনিট নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির শিরা–উপশিরা। দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পকারখানার কাঁচামাল, রপ্তানিযোগ্য পণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সবকিছুরই প্রবেশ ও প্রস্থানের প্রধান দ্বার এই বন্দর। ফলে এখানে এক দিনের স্থবিরতাও বহুমাত্রিক ক্ষতির জন্ম দেয়। টানা কয়েক দিনের অচলাবস্থা দেশের রপ্তানি খাতকে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্প সময়ানুবর্তিতার ওপর নির্ভরশীল। নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও তৈরি হয়। ক্রয়াদেশ বাতিল, মূল্যছাড়ের চাপ, ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর আশঙ্কা সব মিলিয়ে এই ক্ষতির হিসাব কেবল কয়েক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এটিকে দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার যুক্তিতে ব্যাখ্যা করলেও শ্রমিক–কর্মচারীদের বড় একটি অংশ এটিকে দেখছেন জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে। তাদের আশঙ্কা এই ইজারার ফলে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হবে, স্থানীয় সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হবে এবং ধীরে ধীরে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ বিদেশি হাতে চলে যাবে।

এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অপরিকল্পিত বেসরকারিকরণ ও বিদেশি ইজারা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে। অনেক সময় প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর কিংবা কর্মসংস্থান সুরক্ষার নিশ্চয়তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ, ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই উদ্বেগ ও প্রশ্নের জবাবে কর্তৃপক্ষ সংলাপের পথ বেছে নেয়নি। বরং বদলি, হয়রানি ও দমনমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে যুক্ত শীর্ষ নেতাসহ একাধিক কর্মচারীকে দূরবর্তী বন্দরে বদলি করা হয়েছে। শ্রমিকদের চোখে এটি ছিল শাস্তিমূলক বার্তা এক ধরনের শক্তি প্রদর্শন। এর ফল হিসেবে আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রূপ নেয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অবকাঠামো পরিচালনা নয়; সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আস্থা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য। এখানে সেই আস্থার জায়গাতেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যদি আগেভাগেই শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে খোলামেলা, স্বচ্ছ ও অর্থবহ আলোচনা করত, তাহলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। উন্নয়ন মানে কেবল বিদেশি বিনিয়োগ নয়; উন্নয়ন মানে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এই অচলাবস্থার প্রভাব বন্দর চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার জমে পাহাড় তৈরি হয়েছে। অনেক ডিপো ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমদানি পণ্য খালাস না হওয়ায় শিল্পকারখানায় কাঁচামালের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে, জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর জন্য প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে আমদানিকারক–রপ্তানিকারক ও ভোক্তাদের। অর্থাৎ বন্দরের অচলাবস্থা ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্যতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কোনো দেশের বন্দর ব্যবস্থায় বারবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস খোঁজার কথা ভাববেন। এটি কেবল একটি মৌসুমের ক্ষতি নয়; এটি দীর্ঘ মেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

এই বাস্তবতায় এখনই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। প্রথমত, আন্দোলনরত শ্রমিক–কর্মচারীদের সঙ্গে অবিলম্বে সংলাপ শুরু করতে হবে। এই সংলাপ হতে হবে আন্তরিক ও ফলপ্রসূ লোক দেখানো নয়। দ্বিতীয়ত, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে কেন এই সিদ্ধান্ত, কী শর্তে, কত মেয়াদে, দেশের কী লাভ হবে, কর্মসংস্থানের কী নিশ্চয়তা রয়েছে। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা ফিরবে না। তৃতীয়ত, আন্দোলন দমাতে নেওয়া বদলি ও হয়রানিমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো পক্ষের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হতে পারে না। এটি জাতীয় স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে যেমন বন্দর সচল রাখা সম্ভব নয়, তেমনি বন্দর অচল রেখে দাবি আদায়ের পথও দেশকে গভীর ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। দায়িত্বশীলতা চাই দুই পক্ষেরই। তবে মনে রাখতে হবে, নেতৃত্ব ও সমাধানের ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।

এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক আস্থার ক্ষয় ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংঘাত নয়, সংলাপ; জেদ নয়, যুক্তি; দমন নয়, দায়িত্ব।চট্টগ্রাম বন্দরকে বাঁচানো মানেই দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানো।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আমার বার্তা/সাদিয়া সুলতানা রিমি/এমই

কৃষক কার্ড কৃষিতে আনছে নতুন দিনের বার্তা

দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। কৃষির সাথে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ জড়িত।

অটোরিকশা সংকটের মানবিক সমাধান

রাস্তায় অটোরিকশা এখন আর শুধু একটি যানবাহন নয়; এটি লাখো মানুষের জীবিকার শেষ আশ্রয়। অথচ

রোহিঙ্গা সংকট- ইরান যুদ্ধ ও মানবিক সহায়তায় প্রভাব

ইরান ও আমেরিকা- ইসরায়েল যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে একটি বিশাল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত

অটিজম: নীরবতার ভেতরে লুকানো সম্ভাবনা ও থেরাপির বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

একটি শিশু যখন ডাকলে ফিরে তাকায় না, চোখে চোখ রাখে না, নিজের জগতে ডুবে থাকে
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আন্দামান সাগরে নৌকাডুবে ২৫০ যাত্রী নিখোঁজ, আছেন বাংলাদেশি নাগরিকও

বিরোধী দলের ওপর ‘স্বৈরাচারের ভূত’ ভর করেছে: তারেক রহমান

একদিনে হাম ও হামের উপসর্গে ৯ জনের মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

থাইল্যান্ডে নববর্ষের উৎসবের চারদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৪ জন নিহত

রাস্ট্রায়ত্ব তেল শোধনাগর ইষ্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ ঘোষণা

মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ীর ওপর কিশোর গ্যাংয়ের হামলা

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন

দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

মহাবিশ্বের প্রসারণ মাপলেন আইইউবির ড. আশরাফসহ ৪০ বিজ্ঞানী

পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক

বৈশাখী শোভাযাত্রা দেখলেন ইইউ-নরও‌য়ের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি কূটনীতিকরা

শেষ হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা, ফ্রি প্যালেস্টাইন প্ল্যাকার্ডে ভিন্ন বার্তা

সবাই যেন নির্ভয়ে গাইতে পারে, বাঙালি যেন শঙ্কামুক্ত জীবন যাপন করে: ছায়ানট সভাপতি

কানাডায় প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ফেডারেল এমপি হলেন ডলি বেগম

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে ফের সংলাপে বসতে চায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ঢোল-বাদ্য আর রঙিন মোটিফে শুরু বৈশাখী শোভাযাত্রা, ঢাবিতে উৎসবের ঢল

রমনার বটমূলে চলছে বর্ষবরণে ছায়ানটের বর্ণিল আয়োজন

দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক খাদে, ধান কাটার ৭ শ্রমিক নিহত

নতুন বছরে নিজেকে সুস্থ রাখতে

১৪ এপ্রিল ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা