
প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া অনেক আগেই শেষ হলেও এর নেপথ্যের পরিকল্পনা, সহায়তাকারী ব্যক্তি কিংবা সম্ভাব্য বৃহত্তর ষড়যন্ত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন আজও আলোচনায় রয়েছে।
সম্প্রতি মামলার পলাতক আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতারের পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তার জিজ্ঞাসাবাদে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসছে, যা শুধু তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নয়, বরং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে সংঘটিত নানা ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেনা হেফাজতে থাকা মোজাফফরের কাছ থেকে তার দীর্ঘ পলাতক জীবন, বিদেশে অবস্থান, সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং ঘটনার সময়কার সামরিক যোগাযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় ভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি কীভাবে এত দীর্ঘ সময় পরিচয় গোপন রেখে বিদেশে অবস্থান করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে বাংলাদেশে ফিরে প্রায় তিন দশক আত্মগোপনে থাকতে পেরেছিলেন। এই পুরো সময়ে তার যোগাযোগ, আশ্রয়, অর্থায়ন এবং সহযোগীদের পরিচয় উদঘাটন করাই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সূত্র।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোজাফফর দাবি করেছেন, ১৯৯৮ সালে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছদ্মপরিচয়ে বসবাস করেন। পরে রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকায় পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেও নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখেন।
তদন্তকারীরা এখন অনুসন্ধান করছেন, এত বছর তিনি কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলেছেন এবং এই সময়ে তাকে কারা সহযোগিতা করেছে।
বিভিন্ন সময়ে জিয়া হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা দাবি ও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য ভূমিকা, তৎকালীন সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোজাফফরের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, মোজাফফরের বিরুদ্ধে নতুন করে সামারি অব এভিডেন্স, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং পরবর্তী কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তার ভাষায়, বিচার চলাকালে অনেক অমীমাংসিত বিষয় সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, পলাতক থাকার পেছনের সহযোগিতা, তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্ন আদালতের আলোচনায় উঠে আসার সুযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়া হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়, যার অনেক প্রশ্নের এখনও সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি। ফলে মোজাফফরের গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ তদন্তের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে তারা মনে করেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই, প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন কেবল রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার বার্তা/এমই

