
দৈনন্দিন জীবনে আমাদের অন্যতম একটি সাধারণ কিন্তু চরম অস্বস্তিকর শারীরিক সমস্যা হলো গোড়ালি ব্যথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা ফেলার সময় সুই ফোটার মতো তীব্র ব্যথা, কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ হাঁটতে গেলে গোড়ালিতে কামড়ে ধরা—এমন সমস্যায় কমবেশি অনেকেই ভুগে থাকেন। মেডিকেলের ভাষায় একে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়াটিস (Plantar Fasciitis) বা গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়া (Heel Spur) বলা হয়। দীর্ঘদিন এই ব্যথায় ভুগতে থাকা রোগীদের জন্য একসময় ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড ইনজেকশনই ছিল প্রধান ভরসা, যার রয়েছে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
শকওয়েভ থেরাপি’ চিকিৎসা
তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এখন কোনো প্রকার অস্ত্রোপচার বা ওষুধ ছাড়াই এই ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আর এই যুগান্তকারী চিকিৎসার নাম এক্সট্রাকোর্পোরাল শকওয়েভ থেরাপি (ESWT) বা সংক্ষেপে শকওয়েভ থেরাপি।
শকওয়েভ থেরাপি কী?
নাম শুনে ‘শক’ বা বৈদ্যুতিক শক মনে হলেও, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এটি মূলত একটি অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শাব্দিক তরঙ্গ (High-energy Acoustic Waves) ব্যথার সুনির্দিষ্ট স্থানে বা গোড়ালির ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুতে প্রয়োগ করা হয়।
এটি কীভাবে কাজ করে?
গোড়ালির নিচে যে শক্ত পর্দা বা টিস্যু (Plantar Fascia) থাকে, তাতে অতিরিক্ত চাপ বা মাইক্রো-টিয়ার (ক্ষুদ্র ফাটল) হলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্লামেশন তৈরি হয়। শকওয়েভ থেরাপি মূলত তিনটি উপায়ে কাজ করে যেমন-
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি:
শাব্দিক তরঙ্গ ব্যথার স্থানে নতুন রক্তনালী তৈরি করতে উদ্দীপনা যোগায়, যার ফলে ওই অংশে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়।
কোষের পুনর্গঠন (Healing):
এটি শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু দ্রুত মেরামত করতে সাহায্য করে।
ক্যালসিয়ামের আস্তরণ দূর করা: গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়ার (Heel Spur) ফলে যে ক্যালসিয়ামের শক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, শকওয়েভ তা ভেঙে দিতে সাহায্য করে।
শকওয়েভ থেরাপির সুবিধা:
কোনো প্রকার অস্ত্রোপচার বা কাটার প্রয়োজন হয় না (Non-invasive)।
ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচা যায়।
এটি একটি ওপিডি (OPD) ভিত্তিক চিকিৎসা, অর্থাৎ থেরাপি নিয়ে সোজা বাড়ি চলে যাওয়া যায়, হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না।
দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক ব্যথার ক্ষেত্রে এর সাফল্যের হার প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ।
চিকিৎসা পদ্ধতি ও সময়সীমা
শকওয়েভ থেরাপি দিতে কোনো অবশকারী ইনজেকশন বা অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন হয় না। ব্যথার তীব্রতা এবং রোগের ক্রনিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে সাধারণত ৩ থেকে ৫টি সেশনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রতি সেশনে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে এবং সাধারণত সপ্তাহে একবার করে এই থেরাপি দেওয়া হয়।
কারা এই চিকিৎসা নিতে পারবেন?
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে গোড়ালি ব্যথায় ভুগছেন এবং ওষুধ, কুসুম গরম পানির সেঁক কিংবা সাধারণ ফিজিওথেরাপিতেও কোনো সুফল পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য শকওয়েভ থেরাপি অত্যন্ত কার্যকরী। বিশেষ করে ক্রীড়াবিদ, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ এবং যাঁদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, তাঁরা এই চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
সতর্কবার্তা
শকওয়েভ থেরাপি অত্যন্ত নিরাপদ হলেও গর্ভবতী নারী, শরীরে পেসমেকার লাগানো রোগী, তীব্র রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা বা ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা যাবে না। তাই এই থেরাপি নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
উপসংহার: গোড়ালি ব্যথাকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে তা কোমর বা হাঁটু ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বছরের পর বছর ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে লিভার বা কিডনি ঝুঁকিতে না ফেলে, সঠিক সময়ে আধুনিক ‘শকওয়েভ থেরাপি’ গ্রহণ করুন সাথে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করুন তাতেই গোড়ালি ব্যথা থেকে খুব দ্রুত সময়ের মাঝে মুক্তি মিলবে এবং সচল, ব্যথামুক্ত জীবন উপভোগ করা সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট, রিঅ্যাকটিভ ফিজিওথেরাপি সেন্টার।
আমার বার্তা/ডা. মো. সাইদুর রহমান/এমই

