
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও জনবল সংকটের কারণে আইসিইউ স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভাগের জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালগুলোতে আধুনিক সরঞ্জাম পড়ে আছে দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সদের অভাবে। এতে মুমূর্ষু রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
বিশেষ করে হাম ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীদের বাধ্য হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও অনুমোদিত পদের অভাব থাকায় কোনোরকম অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় আইসিইউ কার্যক্রম পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিইউ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের ঘাটতিই এই সংকটের প্রধান কারণ। বর্তমানে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রাজশাহীতে আইসিইউর জন্য প্রচুর চাপ, প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫-২০ জনের অধিক রোগী ওয়েটিং লিস্টে থাকে।
রামেক হাসপাতালের ৪০ শয্যার আইসিইউ ছাড়া বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ নিয়ে সরকার-বেসরকারি চারটি হাসপাতালে আইসিইউ ৫৪টি শয্যার। রাজশাহী ছাড়া বাকি জেলা হাসপাতালের আইসিইউগুলো রোগীর চিকিৎসায় কাজে আসে না জনবলের অভাবে। ফলে দীর্ঘ ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে আইসিইউগুলো।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। তবে কোনো যন্ত্রপাতি নেই। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৮টি আইসিইউ শয্যা লোকবল সংকটে পড়ে আছে। এমনকি বেসরকারি টিএমএসএস হাসপাতালেও ১৪টি শয্যার মধ্যে মাত্র ৪টি সচল রয়েছে।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আইসিইউর জন্য সরঞ্জাম থাকলেও দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের অভাবে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৬টি এবং শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি অত্যাধুনিক আইসিইউ শয্যা অচল পড়ে নষ্ট হচ্ছে। জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে ১০টি আইসিইউ বেড এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করা হলেও জনবল (অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসক) না থাকায় আজও তা চালু করা যায়নি। ফলে আইসিইউ প্রয়োজন হওয়া এসব রোগীদের রেফার্ড করা হয় রাজশাহীতে।
রামেক হাসপাতাল এই বিভাগের আইসিইউ প্রয়োজনে রেফার্ড করা রোগীদের একমাত্র ভরসা। এখানে ৪০ শয্যার আইসিইউ চলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। এই ইউনিটটি এখনো সরকারিভাবে অনুমোদিত নেই। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও সংকট রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সের। অন্যান্য কর্মীদের প্রেষণে বা শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
রোগীর স্বজনরা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে এখানে প্রত্যেকদিন অনেক হার্টের রোগী এবং শ্বাসকষ্টের রোগী ভর্তি হচ্ছে। তারপরে ইদানীং অনেক হামের বাচ্চারা ভর্তি হচ্ছে। এসব রোগী যারা খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে এখানে আইসিইউ না থাকার তাদের দ্রুত রাজশাহী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। রাজশাহী তো আর কাছে না, যে হুট করে আমরা চলে যাব।
তত্ত্বাবধায়ক মো. মশিউর রহমান বলেন, রাজশাহীতে পাঠাই সেসব রোগীকে, যাদেরকে মনে করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে ঠিক কতজনের আইসিইউ লাগবে এবং কতজনের লাগবে না, রোগীর পরিস্থিতি দেখে ওখানে রেফার্ড করা হয়।
রবিন আহম্মেদ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, সিরাজগঞ্জে মেডিকেলে আইসিইউ থাকা সত্ত্বেও আমারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। আইসিইউর কারণে অনেক রোগী মারা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা পায় না। জনসাধরণের অনেক কষ্ট হয়। চালু হলেই ভালো হয়।
মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডাক্তার মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এটা ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে আইসিইউ এবং এইচডিইউ মিলে ১০ বেড (আট বেড এবং দুই বেড আইসিইউ) ১০ বেডের জন্য এটা ব্যবস্থা করা ছিল। সেই অনুযায়ী যন্ত্রপাতিগুলো এসেছে কিন্তু জনবলের অভাবে চালু হয়নি।
করোনাকালীন জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতাল ১০টি আইসিইউ বেড বরাদ্দ পায়। হাসপাতালের পুরনো ভবনে বসানো আইসিইউটি চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল সংকটে আজও চালু করা যায়নি। জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক বলেন, হাসপাতালটা ২৫০ শয্যার হলেও রোগী থাকে ৫০০-এর বেশি। ২০২২ সালে আইসিইউ-এর যন্ত্রপাতি কিনে রেডি করেছি এবং ভৌত কাঠামো রেডি করা আছে। আমরা অবশ্য অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসকের চাহিদা দিয়েছি মন্ত্রণালয়ে। অজ্ঞানের ডাক্তারের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, এখানে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৪০টি। আইসিইউ ইউনিট এটিও কিন্তু সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। সরকার থেকে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত নয়। আইসিইউ সেটআপ চালাতে প্রথমে লাগবে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আইসিইউ বিষয়ের ওপরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত নার্স বা অন্যান্য দক্ষ জনবল। সেগুলো আমরা লোকালি ট্রেনিং দিয়ে, কোনো প্রেশনে সংযুক্ত করে, কোনো সময় কোর্সের কোনো স্টুডেন্টকে জোর জবরদস্তি করে চালাচ্ছি। এখানে ন্যূনতম ১০ জন আইসিইউ-এর ওপরে বিশেষায়িত চিকিৎসক প্রয়োজন। এখানে রয়েছে মাত্র একজন।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আইসিইউ চালানোর জন্য অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট অথবা ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে যাদের ডিগ্রি রয়েছে তারা আইসিইউগুলো চালাতে পারে। বা নার্সদের ক্ষেত্রে আমাদের স্পেশালাইজডভাবে তাদেরকে ট্রেনিং করাতে হয়। সেগুলোর কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালেই আইসিইউ ফ্যাসিলিটি থাকবে আমাদের পরিকল্পনায় আছে।

