প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দার্শনিক ভিত্তি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৩, ১০:১৮ | অনলাইন সংস্করণ
রতন বালো
প্রিন্ট ভার্সন

দেশের অনন্য অর্জন পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল এবং কমিউনিটি ক্লিনিক। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক বিপ্লবের সুচনা এটি।
আর অন্যদিকে সারাদেশের মানুষের দোরগোড়ায় বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। এর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়েছে।
সরকারের এই তিন উদ্যোগই সরাসরি জনগণের জন্য। এগুলো জনগণের ক্ষমতায়নের এক অনন্য নজীর।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ১০টি উদ্যোগের মধ্যে পদ্মা সেত, মেট্টোরেল ও কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে অন্যতম। মেগা প্রকল্প তিনটি ভিন্ন ধারার উন্নয়নের উদ্যোগ।
পদ্মা সেতু একটি অবকাঠামো। যানজট সমস্যা কিছুটা দূর করতেই মেট্টোরেল এবং দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক।
কিন্তু কার জন্য এই পদ্মা সেতু? এই পদ্মা সেতু বৈষম্যের শিকার দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের জন্য উন্নয়নের দুয়ার। এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী সরাসরি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে। তাদের জীবন, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছে।
এটি কেবল একটি আধুনিক দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্য মৈলী নয়, জনগণের উন্নয়নের জীবন কাঠি। অন্যদিকে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সেবার এক বৈপ্লবিক মডেল।
কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দেশের সকল মানুষকে প্রাথমিক এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছেন পিছিয়ে পরা, সুবিধা বঞ্চিত, বৈষম্যের শিকার প্রান্তিক জনগোষ্টী।
পদ্মা সেতু এবং কমিউনিটি ক্লিনিক শেষ পর্যন্ত এসে অভিন্ন লক্ষ অর্জনে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।
এই তিন উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তা প্রমাণিত হয়েছে। এই দুই উদ্যোগই বৈষম্য বিলোপের ক্ষেত্রে মাইল ফলক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট এবং কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে দার্শনিক ভাবনাও অভিন্ন।
বৈষম্য মুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, সোনার বাংলা বিনির্মাণের দুটি পিলার। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, দেশের সরকার প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। গরীব মানুষের উন্নয়ন চায়। এই সরকার জনগনের সরকার।
প্রশ্ন হলো পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো উদ্যোগ দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেষ হাসিনা কেন নিলেন? কেন শেখ হাসিনা উন্নয়ন ভাবনা প্রান্তিক বৈষ্যম্যের স্বীকার জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আকাঙ্কা আচ্ছন্ন? এর কারণ শেখ হাসিনার রাষ্ট্র চিন্তা দর্শন বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার মূল দর্শনই হচ্ছে দেশপ্রেম। দেশপ্রেম যার দর্শনে থাকে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই দেশের প্রত্যেক জনগণকে সুখে শান্তিতে রাখতে চান।
এটি করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দেশের জনগণকে দার্শনিকের সব কাজে অন্তর্ভূক্ত করা এবং তাদের নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে অবিহিত করা।
তিনি বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলার জনগণ দেশের মূল জনগণের সাথে একত্রে ছিলো না, তাদের তিনি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এক করলেন। চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সকল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত হলো।
কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি দান করলেন জনগণ, আর কমিউনিটি ক্লিনিক ঔষধ থেকে শুরু করে সর্বকিছু দিলেন সরকার। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিদিন চার লাখের বেশি মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও পুষ্টিসেবা পাচ্ছে এবং ২৭ ধরনের ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষ বিনা মূল্যে পাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ঘরের দোরগোড়ায় পরম বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্লিনিকগুলো।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ১৯৭১ সালের পরে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল।
বঙ্গবন্ধু তার দূরদর্শী চিন্তাধারায় সুন্দরভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করেন এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুধু শহরকেন্দ্রীক ছিলনা। জেলা, উপজেলা, গ্রাম, ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃত ছিল।
তিনি জানান, আমি প্রধানমন্ত্রীকে একবার জিজ্ঞেস করছিলাম, এত সুন্দর একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কমিউনিটি ক্লিনিকের চিন্তাধারা আপনার (প্রধানমন্ত্রী) মাথায় কিভাবে এলো? উনি বলেছিলেন, আসলে এটা বঙ্গবন্ধু’র চিন্তাধারায় ছিলো।
কিন্তু দুর্গাগ্যজনকভাবে তিনি সেটা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শেখ হাসিনা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছেন। এটা
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা সুন্দর আশ্রয়স্থল হিসেবে স্বীকৃত, প্রশংসিত এবং সারা পৃথিবীতে একটা রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এ বিষয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ফেরদৌস জানান, বাঙালি মানসপটে পদ্মা নামটি উল্লেখযোগ্য। বিশেষভাবে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে পদ্মা নদী একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর সাথে জড়িত আছে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, জীবন-জীবিকা, যোগাযোগ, কৃষি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সবকিছু। কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রতিদিন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ১০০ রোগি বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স রাজধানীরমুখী হতো।
কিন্তু রাতের অন্তকারে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, কুয়াশা কিংবা ফেরির অভাবে ফেরিঘাটে অনেক রোগীকে শেষ চিকিৎসাটি না নিয়েই পৃথিবী ত্যাগ করতে হয়েছে।
এমনকি ১’শ কিলোমিটার ঘুরে আরিচা ঘাটে এসেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে অকাল মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হয়েছে বহু মানুষকে। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে এ সমস্যা দূর হয়েছে।
তিনি আরো জানান, রাজধানীর ঢাকায় অবস্থিত শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের মত বিশেষায়িত হাসপাতাল আমাদের অঞ্চলে গড়ে তুলতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে।
সুতরাং এমন অবস্থায় তাদের ঢাকায় পাঠানো অনেক ক্ষেত্রে দু:স্বপ্নের মত ছিল। দার্শনিক নেত্রী পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ঢাকার সকল সুবিধা নাগালের মধ্যেই এনে দিলেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করেন।
এবি/ওজি
