পার্ক এভিনিউ, এ. আজিজ খান টাওয়ার ও সিলিকন পিস টাওয়ার ঘিরে গুরুতর অভিযোগ; অনুমোদনের বাইরে নির্মাণের কথা স্বীকার সংশ্লিষ্টদের
মাতুয়াইলে রাজউকের বিধিমালা লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ
কুমার সনি

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় রাজউকের অনুমোদন ও প্রযোজ্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে হাজী বাদশা মিয়া রোডের ৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত পার্ক এভিনিউ ও এ. আজিজ খান টাওয়ার এবং ৬ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর প্লটে অবস্থিত সিলিকন পিস টাওয়ার নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমোদনের বাইরে ভবন নির্মাণ, ভবন নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যফলকে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং নির্মাণস্থলে নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ভবনের কোনো কোনোটি অনুমোদিত নকশা ও ব্যবহারের শর্তের বাইরে নির্মিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভবনের প্রতিনিধিদের বক্তব্যেও অনুমোদনের বাইরে নির্মাণের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে প্রতিটি ভবনের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমোদন, ব্যবহারের অনুমতি এবং বাস্তব নির্মাণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, ভবনগুলোর নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গিয়ে একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদককে হুমকি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মারুফ হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ভবনগুলোর বিষয়ে রাজউক কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৬ কাঠার জমিতে ১৩ তলা পার্ক এভিনিউ
মাতুয়াইলের হাজী বাদশা মিয়া রোডের ৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত পার্ক এভিনিউ ভবনটি নিয়ে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ১৬ কাঠা বা ১০ হাজার ৪৬৪ বর্গফুট জমির ওপর ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির উচ্চতা ১৩ তলা এবং প্রতি তলায় আনুমানিক ৮ হাজার বর্গফুট নির্মিত জায়গা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ভবনটি আবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হলেও বর্তমানে সেখানে বাণিজ্যিক ও আবাসিক—উভয় ধরনের নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে অনুমোদিত ব্যবহারের শর্তের বাইরে ভবনটি ব্যবহার বা নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভবনের চারপাশে রাজউকের ভবন নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যফলক দৃশ্যমান নেই এবং নির্মাণস্থলে যথাযথ নিরাপত্তাবেষ্টনীও দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ভবনটির প্রকৌশলী মনিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং হুমকি দেন।
পরে ভবনমালিক পক্ষের প্রতিনিধি আব্দুল মালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকৌশলীর আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ভবনটি যতটুকু নির্মাণ করা হয়েছে, ততটুকুর জন্য রাজউকের অনুমোদন পাওয়া যায়নি বলে তাঁর বক্তব্য।
আব্দুল মালেকের এই বক্তব্য ভবনটির নির্মাণ অনুমোদন ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে সম্ভাব্য অসংগতির বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে অনুমোদিত নকশার তুলনায় কতটুকু অতিরিক্ত নির্মাণ করা হয়েছে এবং ভবনটির ব্যবহার অনুমোদনের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা রাজউকের নথি ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অনুমোদনের বাইরে নির্মাণের অভিযোগ এ. আজিজ খান টাওয়ারে
একই সড়কে অবস্থিত এ. আজিজ খান টাওয়ার নিয়েও অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভবনটির জমির মালিক মো. আইয়ুব খান। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ৫ হাজার ২৩২ বর্গফুট জমির ওপর ১০ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি তলায় আনুমানিক ৫ হাজার ২২০ বর্গফুট নির্মিত জায়গা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য নির্মাণবিধি অনুসরণ না করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের সামনে রাজউকের নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যফলক থাকলেও তাতে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দৃশ্যমান নেই।
এ সব অভিযোগের বিষয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দেলোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এবং তার নিকট জানতে চাইলে তিনি অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ ও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেন। এ সময় তিনি বলেন, “এই এলাকায় সবাই যেভাবে করতেছে আমরাও ঠিক সেভাবেই করতেছি।”
তবে একই এলাকায় অন্য ভবনেও অনিয়ম হয়ে থাকলেও তা কোনো ভবনের নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বৈধতা তৈরি করে না। প্রতিটি ভবনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের পরিমাণ এবং ব্যবহারের শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
সিলিকন পিস টাওয়ারেও অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ
মাতুয়াইলের হাজী বাদশা মিয়া রোডের ৬ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর প্লটে অবস্থিত সিলিকন পিস টাওয়ার নিয়েও অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভবনটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সিলিকন আবাসন লিমিটেড।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ৫ হাজার ৫৫৯ বর্গফুট জমির ওপর ১০ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি তলায় আনুমানিক ৫ হাজার বর্গফুট নির্মিত জায়গা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ভবনের চারপাশে রাজউকের নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যফলক দৃশ্যমান নেই এবং নির্মাণস্থলে নিরাপত্তাবেষ্টনীরও অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সিলিকন আবাসন লিমিটেডের পরিচালক আনোয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
রাজউকের তদারকি কোথায়?
মাতুয়াইল এলাকায় অভিযোগ ওঠা ভবনগুলোর নির্মাণ অনুমোদন, নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের সামঞ্জস্য এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মারুফ হোসাইনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরে সরাসরি মহাখালীর রাজউক জোনাল অফিসে গিয়েও তাঁকে তাঁর আসনে পাওয়া যায়নি। এ সময় তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধান ইমারত পরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম (মনি) উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সামনেই মারুফ হোসাইনকে কয়েক দফা মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, ভূমির ব্যবহার, প্রযোজ্য নির্মাণবিধি ও জননিরাপত্তার শর্ত অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভবন অনুমোদনের বাইরে নির্মিত হলে বা অনুমোদিত ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মাতুয়াইলের পার্ক এভিনিউ, এ. আজিজ খান টাওয়ার ও সিলিকন পিস টাওয়ারের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের তুলনামূলক পরিমাপ, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিক ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গ্রহণ, অভিযোগের বিষয়ে রাজউকের নথি পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিরা।
নগর পরিকল্পনা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। মাতুয়াইলের এসব ভবন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তিতে রাজউকের কার্যকর ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
