অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রাসেল খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়
প্রকৌশল বিভাগে প্রশাসনিক ধস
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার প্রকৌশল বিভাগে বর্তমানে এক চরম অরাজকতা ও প্রশাসনিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এহতেশামুল রাসেল খান। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিলকৃত একটি সুদীর্ঘ অভিযোগপত্রের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিহীন পদোন্নতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং রীতিমতো পিলে চমকানো।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাসেল খান সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী—যিনি বিভাগে 'সাধু খাঁ' নামে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন—তাদের সাথে এক বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ও সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই শক্তিশালী বলয়ের ছত্রছায়ায় থেকেই তিনি প্রকৌশল বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক কাঠামোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসে জ্যেষ্ঠতার নীতিমালাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এবং বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির কোনো প্রকার বৈধ সুপারিশ ছাড়াই ২৬ জন অতি যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এই নজিরবিহীন ঘটনার ফলে বিভাগে কর্মরত পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যেখানে মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হওয়ার কথা, সেখানে রাজনৈতিক তদ্বির আর অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে; এটি আমাদের পুরো পেশার জন্য এক লজ্জাজনক অধ্যায়।"
রাসেল খানের এই ক্ষমতার দাপট কেবল পদোন্নতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তিনি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে একই সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব কুক্ষিগত করে রাখেন। তিনি একদিকে যেমন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে ফিজিবিলিটি স্টাডি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বও নিজের দখলে রেখেছেন। একই ব্যক্তির হাতে প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং সেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা থাকায় সেখানে দুর্নীতির এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অভিযোগপত্রের ভাষ্যমতে, রাসেল খান একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সাথে গোপন আঁতাত করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন পকেটে পুরছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই তিনি প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট বাড়িয়ে সরকারি অর্থের অপচয় করছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে একজন সংক্ষুব্ধ ঠিকাদার বলেন, "রাসেল খানের সাজানো নিয়মের বাইরে গিয়ে টেন্ডার পাওয়া এখন দিবাস্বপ্ন মাত্র; প্রতিটি কাজের জন্য তাঁকে এবং তাঁর চক্রকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দিলে কোনো ফাইল নড়ে না।" এই সুসংগঠিত দুর্নীতির ফলে উন্নয়ন কাজের গুণগত মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল অর্থের পাহাড় কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শিকড় ছড়িয়েছে বিদেশের মাটিতেও। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাসেল খান রাজধানীর উত্তরার অভিজাত এলাকা, পূর্বাচলের দামী প্লট এবং সাভার ও গাজীপুর সংলগ্ন এলাকায় বিঘা প্রতি বিঘা জমি ও রাজকীয় খামারবাড়ি গড়ে তুলেছেন। তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বিলাসবহুল জাপানি ব্রান্ডের গাড়ি রয়েছে, যার অধিকাংশেরই ক্রয়ের অর্থের কোনো বৈধ উৎস নেই। গোয়েন্দা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে, তিনি অবৈধভাবে অর্জিত শত শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও কানাডায় পাচার করেছেন। সেখানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের নামে বিলাসবহুল আবাসন ও 'সেকেন্ড হোম' নিশ্চিত করেছেন বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নিজের অর্জিত কালো টাকা সাদা করার প্রচেষ্টায় তিনি সম্পদের বড় একটি অংশ স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে নথিভুক্ত করেছেন, যা দুর্নীতি দমন আইনের সরাসরি পরিপন্থী।
এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিযোগকারী এনামুল কবির বলেন, "দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমি এই লুটপাট মেনে নিতে পারি না। রাসেল খানের মতো ব্যক্তিরা আমাদের উন্নয়নের অন্তরায়। আমি দুদকের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছি যেন তাঁর বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তাঁর অর্জিত সকল অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়।" এই অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগের প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, "আমরা অভিযোগের কপি হাতে পেয়েছি এবং এটি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে; সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।" সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া, এই তদন্ত যেন কোনো প্রভাবশালীর চাপে থমকে না যায়। রাসেল খানের এই দুর্নীতির মহাকাব্য তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হলে তা হবে প্রশাসনের জন্য একটি বড় শুদ্ধি অভিযান। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল প্রকৌশল বিভাগের হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আমার বার্তা/এমই
