মাঠ প্রশাসনে কঠোর বার্তা
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৪, ১৯:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ
মেহ্দী আজাদ মাসুম:

# শেরপুরের সাংবাদিককে জেলে পাঠানোর ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেও। ঘটনায় তার ভূমিকা কী ছিলো, সেসময় তিনি কোথায় ছিলেন, তিনি কী বিষয়টি জানতেন, তার তদন্ত শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
# সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ এবং অন্যান্য আইন-বিধি অনুসরণ করেই সকল গণকর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে : আবু আলম মো. শহিদ খান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব
জনগণের সেবক হিসেবে মাঠ প্রশাসনে পদায়িত হওয়া কিছু কর্মকর্তার অসাদাচরণে ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার বার্তা দেয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের। জানিয়ে দেয়া হয়েছে, জনগণের সেবায় ব্যত্যয় ঘটলে, অথবা অসাদাচরণ উশৃঙ্খলতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার হলে কেউ ছাড় পাবেন না। তাৎক্ষণিক ওএসডি হবেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। এসব বিষয়ে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সতর্ক এবং সচেতনতার লক্ষ্যে বিভাগীয় কমিশনারদের কাউন্সিলিং করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনে উশৃঙ্খলতা বেড়ে যাওয়ায় গত বছরও এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন বেশ-কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও ইউএনও।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, শেরপুরের নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) এক সাংবাদিককে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হলে নজরে আসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের। বিষয়টিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘটনায় ইউএনও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কী না, প্রকৃত কী হয়েছিলো নকলা উপজেলায়, ইতিমধ্যেই তার তদন্ত শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের ভূমিকা কী ছিলো, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ইউএনও’র কার্যালয়ে তথ্য চেয়ে সাংবাদিকের আবেদনের বিষয়ে কেন কারাদণ্ড দেয়ার ঘটনা ঘটলো, বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসক কী দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি কী বিষয়টি অবহিত ছিলেন, ঘটনার সময় তিনি কোথায় ছিলেন, তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঐ সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) দেশের মাঠ প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ নির্দেশনা সম্বলিত একটি চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের স্বাক্ষর করা ঐ চিঠিতে মাঠ প্রশাসনে আবারো কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর মাঠ প্রশাসনে এটাই প্রথম নির্দেশনা।
সূত্র জানায়, চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জনগণের সেবায় ব্যত্যয় ঘটলে, অথবা অসাদাচরণ উশৃঙ্খলতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার হলে কেউ ছাড় পাবেন না। তাৎক্ষণিক ওএসডি হবেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। এরপর শুরু হবে তদন্ত। দোষী সাব্যস্ত হলে কোন কোন ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হবে। এসব বিষয়ে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সতর্ক এবং সচেতনতার লক্ষ্যে বিভাগীয় কমিশনারদের কাউন্সিলিং করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত বছরের প্রথম দিকে মাঠ প্রশাসনে উশৃঙ্খলতা বেড়ে যাওয়ায় এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। সেসব ঘটনায় শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন বেশ-কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও ইউএনও। তাদের দুয়েকজন ছাড়া সবাই শাস্তি ভোগ করছেন এখনও।
সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ঘটনার অন্যতম শেরপুরের নকলা উপজেলায় দৈনিক দেশ রূপান্তর এর স্থানীয় সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়া। গত ৫ মার্চ রানা নকলার ইউএনও’র কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিনের কাছে কয়েকটি প্রকল্পের ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। আবেদনটি কার্যালয়ের গোপনীয় শাখার কর্মচারী শীলার কাছে দিয়ে রিসিভড কপি চান তিনি। শীলা তাকে অপেক্ষা করতে বলেন। রানা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আবার শীলার কাছে রিসিভড কপি চান। তখন শীলা বলেন, ‘ইউএনওকে ছাড়া রিসিভড কপি দেয়া যাবে না।’ পরে রানা জেলা প্রশাসককে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। এতে ইউএনও আরও ক্ষুব্ধ হন। এ বিষয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে নকলা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ইউএনও এবং সিএ শীলা আক্তারের সঙ্গে অসাদাচরণের অভিযোগে রানাকে আটক করে। পরে নকলা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিহাবুল আরিফ ওই কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে রানাকে ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে ওই দিনই জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেন।
এ ঘটনাকে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর হুমকি’ উল্লেখ করে বিভিন্ন সংগঠন এবং সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা শফিউজ্জামানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দু’দিন আগে শফিউজ্জামান রানা জামিনে মুক্তি লাভ করেছেন।
জনপ্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা বিশেষ করে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদমর্যাদার শত শত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ আসছে মাঠ প্রশাসন থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসব অভিযোগ জমা পড়ছে। এর মধ্যে অসাদাচরণ, অনিয়ম ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগই বেশি। ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য গঠন করা হচ্ছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা বেশ কিছু অভিযোগের প্রমাণও মিলেছে। সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ বাস্তবায়নেও ইউএনও এবং সহকারী কমিশনারদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।
অভিযোগ উঠেছে, আলোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত নিয়ে কিছুদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তৎপরতা দেখালেও পরবর্তী সময়ে শ্লথ হয়ে যায়। অল্প শাস্তিতেই পার পেয়ে যান বেশিরভাগ কর্মকর্তা। আবার শাস্তি পাওয়া অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক বা অন্যভাবে প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ থাকায় ‘লঘুদণ্ডে’ পার পেয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পদোন্নতি এবং প্রাইজ পোস্টিংও পেয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়ার পরও তাদের তদবিরের কারণে তা মওকুফও করার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে বাইরে সমালোচনা চলছে।
গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহরুবা ইসলাম একটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরস্কারের ট্রফি ভেঙে ফেলেন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ইউএনওকে নিয়ে সেসময় তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
এ ছাড়া, ঐ সময়ের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর ইউএনও’র কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে বগুড়া সদর উপজেলার ইউএনও সম্প্রতি স্থানীয় উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মচারীকে মারধর করে বিতর্কের জন্ম দেন।
নওগাঁর বদলগাছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে অপদস্ত করে আলোচনায় আসেন। এ রকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসছে।
এসব বিষয়ে প্রশাসনের সাবেক আমলারা মনে করেন, মাঠ প্রশাসনের কেউ কেউ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। এতে মাঠ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উত্তেজিত হওয়া উচিত না। তাদের আরও ঠাণ্ডা থাকা উচিত। মানুষের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করা উচিত।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান আমার বার্তাকে বলেন, ‘আসলে সকলে অসহিষ্ণু নন। কেউ কেউ হয়ে উঠছেন, যা মাঠ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বলা যায়, আগের তুলনায় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে।
ডাকসাইটে এই আমলা বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর বার্তা দেয়ার সময় এসেছে। একই সঙ্গে আইন-বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থাও নিতে হবে। কেউ যেন মনে না করে, জনগণের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে পার পাওয়া যায়।
আবু আলম শহিদ খান বলেন, ‘আমাদের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ এবং অন্যান্য আইন-বিধি অনুসরণ করেই সকল গণকর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
