তাহাফুতুল মালাহিদা

আধুনিক বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে এক দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

ড. মুফতী ইয়াসির নাদিম আল ওয়াজেদীর ‘তাহাফুতুল মালাহিদা’  নিছক নাস্তিকদের আপত্তির জবাব দেওয়ার বই হিসেবে পড়লে বইটির বড় একটি দিক হয়তো ধরা পড়বে, কিন্তু পুরো কাঠামোটি বোঝা যাবে না।

২৮০০-এর বেশি পৃষ্ঠার এই বিশাল সংকলনে মোট ছয় খণ্ডের বারোটি অধ্যায় একত্র করা হয়েছে। মূলত দীর্ঘদিনের একটি অনলাইন কোর্সের পাঠ থেকে বইটির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ফলে এর মধ্যে গবেষণাধর্মী আলোচনা যেমন আছে, তেমনি পাঠদানমূলক ব্যাখ্যার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে।  

বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক আমার কাছে এর ক্রমবিন্যাস। লেখক সরাসরি নাস্তিকতার খণ্ডে ঝাঁপ দেননি। প্রথমে পশ্চিমা সভ্যতা, মানবতাবাদ, আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের ঐতিহাসিক পটভূমি; এরপর জ্ঞানের উৎস ও সংশয়বাদ; তারপর আল্লাহ, ধর্ম ও তাওহিদের প্রশ্ন। অর্থাৎ প্রশ্নটি এগিয়েছেÑআমরা কীভাবে জ্ঞান লাভ করি, সত্য কী, স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রশ্ন কীভাবে বিবেচনা করা যায় এবং সেখান থেকে ওহী ও ধর্মের প্রয়োজনীয়তায় কীভাবে পৌঁছানো যায়। 

এরপর আলোচনায় এসেছে বিবর্তনবাদ, কুরআন ও ওহীর সংরক্ষণ, কুরআনকে ঘিরে আধুনিক আপত্তি, সিরাত ও সুন্নাহ। শেষের খ-গুলোতে আবার আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছেÑলিবারেলিজম, নারীবাদ, সমকামিতা, পরিবার, সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র, বিজ্ঞানবাদ ও বস্তুবাদ পর্যন্ত। ফলে পুরো সিরিজটি শেষ পর্যন্ত শুধু ‘নাস্তিকদের জবাব’ হয়ে থাকে না; বরং আধুনিক মানুষের বিশ্বদৃষ্টিকে ইসলামী জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর থেকে পর্যালোচনা করার একটি বড় প্রচেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। 

বিশেষভাবে চোখে পড়ে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদকে আলাদা করার চেষ্টা। বইটির আলোচনায় বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার পরিবর্তে বিজ্ঞান কী বলতে পারে এবং বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কোন কোন অতিরিক্ত দার্শনিক সিদ্ধান্ত টানা হচ্ছে-এই পার্থক্যটি সামনে আনা হয়েছে। একইভাবে বিবর্তন নিয়েও প্রশ্নটি কেবল ‘বিবর্তন সত্য না মিথ্যা’-এখানে থেমে নেই; বরং কোনো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া স্রষ্টার অস্তিত্বকে অপ্রয়োজনীয় করে দেয় কি না, সেই দার্শনিক প্রশ্নে আলোচনা নেওয়া হয়েছে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বইটি সমকালীন প্রশ্নকে এড়িয়ে যায়নি। কুরআনের সংরক্ষণ, বিগ ব্যাং, পৃথিবীর আকৃতি, মেরাজ, জিহাদ, দাসপ্রথা, নবীজি সা.-এর জীবন, একাধিক বিবাহ, আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের বয়স-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, সেগুলোর অনেকগুলোই আলোচনায় এসেছে। 

তবে এত বড় একটি কাজের মূল্যায়নে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-এটি চূড়ান্ত বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে কোনো গ্রন্থ নয়। বরং এত বিস্তৃত বিষয়ে এত বড় পরিসরে বক্তব্য রাখার কারণে এর বিভিন্ন যুক্তি, তথ্য ও ব্যাখ্যা নিয়ে পৃথক একাডেমিক আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। বইটির সমালোচনাও হওয়া উচিত, তবে সেই সমালোচনা করতে হলে পুরো বই বা সংশ্লিষ্ট আলোচনাগুলো ভালোভাবে পড়ে, লেখকের প্রকৃত বক্তব্য বুঝে, তারপর আপত্তি তোলা দরকার। 

সব মিলিয়ে, তাহাফুতুল মালাহিদা এমন একটি বই, যেটিকে শুধু ধর্মীয় বই হিসেবে দেখলে এর বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন। দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, আধুনিকতা, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক দর্শনের নানা প্রশ্ন এখানে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত হয়েছে। যারা সমকালীন নাস্তিক্যবাদ, সংশয়বাদ ও আধুনিক চিন্তার সঙ্গে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক বুঝতে চান, তাদের জন্য এটি একটি বড় পাঠপ্রকল্প।

তবে ২৮০০+ পৃষ্ঠার বই-এটা এক বসায় পড়ার বই নয়, বসে বসে পড়ার বই। হাতে নিয়ে শুরু করলে সম্ভবত সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হবে, আধুনিকতার সঙ্গে ধর্মের বিতর্ক আসলে শুধু ‘বিশ্বাস বনাম অবিশ্বাস’-এর বিতর্ক নয়; এর গভীরে রয়েছে জ্ঞান কী, সত্য কী, মানুষ কীভাবে সত্যে পৌঁছায় এবং জীবনের চূড়ান্ত অর্থ কোথায়-এসব মৌলিক প্রশ্ন।

বই: তাহাফুতুল মালাহিদা - এক বক্সে ১২টি বই

লেখক : ড. মুফতী ইয়াসির নাদিম আল ওয়াজেদী

অনুবাদক : মাহদি হাসান, মুহাম্মাদ মুস্তাফিযুর রহমান, তাজবীদ উল্লাহ নাবীল, ইমরান হোসাইন নাঈম, সাদিক শাহরিয়ার ও মুহাম্মদ সুহাইলুল কাদের

প্রকাশনী : নাশাত পাবলিকেশন

পৃষ্ঠা: ২৮০০+

মুদ্রিত মূল্য : ৪,১২০ টাকা

ছাড়মূল্য : ৩,০৯০ টাকা