মহানবীর (সা.) স্মৃতিবিজড়িত মক্কার ৫ মসজিদ

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মক্কার মাসজিদুল হারামে দাঁড়িয়ে  কাবা শরীফের প্রথম কাতারের দৃশ্য দেখার চেয়ে আনন্দদায়ক আর কিছুই হতে পারে না একজন মুমিনের জন্য। মসজিদুল হারামের আঙিনায় এক ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করলে বিপুল সওয়াব মেলে। তবে মক্কায় মসজিদুল হারামই একমাত্র মসজিদ নয়, এখানে এমন বেশ কিছু মসজিদ আছে যার সমৃদ্ধ ইতিহাসে আছে এবং মসজিদগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্মৃতি।

মক্কার এমন কিছু ঐতিহাসিক মসজিদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. আর-রায়াহ মসজিদ

জান্নাতুল মুআল্লাহর দিকে যাওয়ার পথে অবস্থিত আর-রায়া মসজিদ। মসজিদটি আল-হুজুন এলাকায় অবস্থিত, যা মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে আল-মসজিদ আল-হারাম সড়কের পাশে অবস্থিত।

আর-রায়াহ শব্দের ইংরেজি অর্থ ফ্ল্যাগ বা পতাকা। ইমাম বুখারির বর্ণনামতে, মক্কা বিজয়ের সময় আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল-হুজুনের এই নির্দিষ্ট স্থানে একটি পতাকা স্থাপন করেছিলেন। এই ঘটনার পর মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হজ-ওমরাহ যাত্রীদের কাছে এই মসজিদ ক্যাট মসজিদ নামেও পরিচিত। যদিও আজ পর্যন্ত এই নামের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২. আল-জিন মসজিদ

আর-রায়াহ মসজিদ পার হওয়ার পর মাত্র ৩০০ মিটার দূরে যে মসজিদ চোখে পড়বে, তা হলো আল-জিন মসজিদ। এই মসজিদটি আল-হারাস মসজিদ নামেও পরিচিত, তবে প্রথম নামটিই বেশি পরিচিত ও সর্বজনগৃহীত।

জিনদের একটি দলের কাছে মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি কাজের স্মারক হিসেবে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-কে নিয়ে আল-হুজুনের এই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং জিনদের জন্য খাবার হিসেবে হাড় নিয়ে যান।

নাম শুনে যেমনটি মনে হতে পারে, এই মসজিদে গিয়ে কিন্তু তেমন কোনো অলৌকিক বা ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন না। তাই আল-জিন মসজিদে গিয়ে কোনো ভৌতিক বা ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতার আশা থাকলে তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো।

৩. আশ-শাজারাহ মসজিদ

আল-জিন মসজিদের ঠিক বিপরীতেই খুঁজে পাবেন আশ-শাজারাহ মসজিদ। বিশ্বনবীর (সা.) এক মহান অলৌকিক ঘটনার স্মরণে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।

সাইয়্যিদুনা ওমর আল-খাত্তাব (রা.) উল্লেখ করেছেন, একদিন মহানবী (সা.) আল-হুজুনে ইসলাম প্রচার করছিলেন, তখন অমুসলিমরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এরপর মহানবী (সা.) দোয়া করেন, হে আল্লাহ, আমাকে এখন আপনার মহান ক্ষমতার একটি নিদর্শন দেখান, যাতে অবিশ্বাসীদের প্রত্যাখ্যান নিয়ে আমি আর পরোয়া না করি। তখন মহানবী (সা.)-কে কাছের একটি গাছকে তার দিকে সরে আসার সংকেত দিতে বলা হয়।

আল্লাহর ইচ্ছায় গাছটি মহানবী (সা.)-এর কাছে আসে এবং তাকে সালাম জানায়। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) গাছটিকে তার আগের স্থানে ফিরে যেতে বলেন। অতীতে যেখানে একটি ছোট স্মারক গম্বুজ ছিল, সেখানে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

৪. বাইআত আর-রিদওয়ান মসজিদ বা হুদাইবিয়া মসজিদ

এরপরের মসজিদটি মূলত ওমরাহ পালনের নিয়ত বা ইহরাম বাঁধার জন্য হাজিদের নির্ধারিত স্থান বা মিকাত হিসেবে পরিচিত।

মসজিদটি হলো হুদাইবিয়া মসজিদ, যা বাইআত আর-রিদওয়ান মসজিদ নামেও পরিচিত। এই মসজিদটি শুমাইসি এলাকায় অবস্থিত, যা মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে এবং মক্কার সীমানা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার বাইরে।

এই ঐতিহাসিক মসজিদটি মহানবী (সা.)-এর প্রতি সাহাবিদের আনুগত্যের সাক্ষ্য বহন করে। এই আনুগত্যের ঘটনাটি ইতিহাসে বাইআত আর-রিদওয়ান নামে পরিচিত।

হিজরি ষষ্ঠ বর্ষে মহানবী (সা.) ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সাহাবিদের একটি বিশাল কাফেলা নিয়ে মদিনা থেকে মক্কায় রওনা হন। কিন্তু মক্কার সীমানায় কুরাইশ বাহিনী তাদের পথ রোধ করে। মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টায় মহানবী (সা.) সাইয়্যিদুনা ওসমান বিন আফফান (রা.)-কে একা মক্কায় পাঠান কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে।

কিন্তু যা দ্রুত শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেই আলোচনা গড়ায় কয়েক দিনে। সাইয়্যিদুনা ওসমানের কোনো খবর পাওয়া যায়নি এবং কুরাইশদের পক্ষ থেকেও কোনো সংবাদ জানানো হয়নি। পরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ওসমানকে হত্যা করা হয়েছে।

এই খবর শুনে মহানবী (সা.) অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এর ফলে তারা রাসুল (সা.)-এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সাইয়্যিদুনা ওসমানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেন।

সাহাবিদের এই বীরত্বপূর্ণ ও অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে কুরাইশ প্রহরীরা ভয় পেয়ে যায় এবং যেকোনো সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ এড়াতে তারা অবিলম্বে সাইয়্যিদুনা ওসমান বিন আফফান (রা.)-কে মুসলমানদের কাছে ফিরিয়ে দেয়।

উলেখ রয়েছে যে, বায়াত গ্রহণের সময় মহানবী (সা.) একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সাইয়্যিদুনা ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর হাত ধরে ছিলেন। আর মাকিল বিন ইয়াসার নামে অন্য এক সাহাবি গাছের ডাল ধরে রেখেছিলেন যাতে তা নবীর গায়ে না লাগে।

সাইয়্যিদুনা ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে গাছটি কেটে ফেলা হয়। তাই গাছটি এখন আর নেই। তবে সেই জায়গায় এখন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে আপনি ভ্রমণ করতে পারেন এবং মসজিদুল হারামে ওমরাহ পালনে যাওয়ার আগে মিকাত হিসেবে ইহরাম বাঁধতে পারেন।

৫. সাইয়্যিদা আয়েশা মসজিদ

এই মসজিদটিও মিকাতের স্থান হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে মসজিদটি মক্কায় প্রবেশের মূল ফটক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

মসজিদুল হারাম থেকে মাত্র সাড়ে ৭ কিলোমিটার উত্তরে মক্কার সীমানার সবচেয়ে কাছে অবস্থিত হওয়ায় মদিনা থেকে আসা অধিকাংশ হজ-ওমরাহ যাত্রী এই বিশাল ও অনন্য মসজিদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন।

এই মসজিদ মসজিদ তানঈম নামেও পরিচিত। মক্কার ভেতরে সাইয়্যিদুনা হামজা এবং সাইয়্যিদুনা ওমর আল-খাত্তাব (রা.)-এর মসজিদের মতো আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে, তবে সেগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা আজও উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়।