রাষ্ট্রের আমানত রক্ষা, ন্যায়-জবাবদিহি ও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

আসসালাম আলাইকুম। শুভ সকাল।
আজ পবিত্র জুমার দিন। সপ্তাহের ব্যস্ততার ভেতর একটি সকাল যেন মানুষকে একটু থামতে বলে—কী পেলাম, কী হারালাম, আর যে আমানত হাতে এসেছে তার কতটুকু ঠিকভাবে রক্ষা করতে পেরেছি? রাষ্ট্রও তো এক ধরনের আমানত। ক্ষমতা, অর্থ, নদীর পানি, ব্যাংকের টাকা, সড়কের শৃঙ্খলা—সবই মানুষের কাছ থেকে রাষ্ট্রের হাতে অর্পিত। সেই ভাবনা থেকেই আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে মনে হয়, আমাদের বড় প্রয়োজন শুধু উন্নয়ন নয়; ন্যায়, জবাবদিহি এবং আমানতের হেফাজত।
গতকাল সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর একটি দলের মহাসচিব যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তির সম্মান নয়—একটি রাজনৈতিক যাত্রারও প্রত্যাশিত পরিণতি। এখন জনমনে প্রত্যাশা একটাই: তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি যেন সংবিধানের আমানত রক্ষা করেন।
এই রাষ্ট্রের আরেকটি বড় আমানত নদী। ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ। বাংলাদেশ এবার ১৯৭৭ সালের চুক্তির তুলনায় আরও বেশি পানির হিস্যা এবং কার্যকর নিশ্চয়তা চাইবে বলে জানিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আশ্চর্যের বিষয়, ওপার থেকেও চুক্তি নবায়ন নিয়ে আপত্তির স্বর শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ আলোচনার টেবিল এবার সহজ হবে না। নদী কেবল ভূগোল নয়—এটি কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ ও আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভবিষ্যৎ। পানির ন্যায্য হিস্যা চাওয়া তাই কোনো আবেগের দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার।
রাষ্ট্রের রাস্তাতেও এবার প্রযুক্তির চোখ বসে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৪৩৭টি এআই ক্যামেরা ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্ঘটনা এবং মহাসড়কের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু হয়েছে। একই প্রযুক্তি দিয়ে মহাসড়কের চাঁদাবাজির ওপরও নজরদারির কথা এসেছে। একদিন হয়তো ট্রাফিক পুলিশকে হাত তুলে গাড়ি থামানোর চেয়ে ক্যামেরাই বেশি কাজ করবে। কিন্তু প্রযুক্তির চোখ যতই তীক্ষ্ণ হোক, মানুষের বিবেকের চোখ বন্ধ থাকলে লাভ সামান্য। এআই আইন ভাঙা ধরতে পারবে; আইন ভাঙার সংস্কৃতি তৈরি হয় কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর মানুষকেই খুঁজতে হবে।
ব্যাংক খাতেও যেন দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা জট খুলতে নতুন দরজা খোলা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে Alternative Dispute Resolution বা মধ্যস্থতার জন্য নতুন নীতিমালা করেছে। (২০০১ সালে এটি সর্বপ্রথম আমার উত্থাপিত প্রি-ট্রায়াল কনফারেন্স সরকার গ্রহণ করেছিল, সেখান থেকে আজকের পর্যায়) উদ্দেশ্য—বছরের পর বছর আদালতে আটকে থাকা মামলা কমিয়ে দ্রুত বকেয়া অর্থ উদ্ধার করা। তবে মধ্যস্থতা যেন ঋণখেলাপিদের জন্য নতুন আশ্রয় না হয়, বরং প্রকৃত অর্থে আমানতকারীর টাকা উদ্ধারের কার্যকর পথ হয়—সেদিকেই নজর রাখতে হবে। মানুষের টাকা ব্যাংকে জমা থাকে বিশ্বাসের ওপর; সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে কোনো সুদ দিয়েই তার ক্ষতিপূরণ হয় না।
আজকের অর্থনৈতিক আলোচনায় তাই আরেকটি বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে কোথায় যেতে চায়? সরকারের নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর আগে প্রস্তাবিত পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোতে আইসিটিকে বিশেষ অগ্রাধিকার এবং প্রতিবছর ২০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যও উঠে এসেছে। বড় লক্ষ্য ঘোষণা করা সহজ; কঠিন হলো সেই লক্ষ্যের জন্য প্রতিষ্ঠান, দক্ষতা, বিনিয়োগ ও সুশাসনের ভিত তৈরি করা।
সামাজিক মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সংসদীয় ভোট, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া ছড়িয়েছে। রাজনীতির এই নতুন দৃশ্যপটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ব্যক্তির নাম নয়—প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তখনই, যখন আজকের বিজয়ীও জানেন যে আগামীকাল জনগণের আদালতে তাঁকেও জবাব দিতে হবে।
২১ আগস্ট এলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতির একটি রক্তাক্ত অধ্যায় ফিরে আসে। ২০০৪ সালের সেই গ্রেনেড হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালে নিম্ন আদালত ৪৯ জনকে দণ্ড দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে সবাইকে খালাস দেন; রাষ্ট্রের আপিলের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। সর্বোচ্চ আদালত বিশেষভাবে আসামিদের কথিত স্বীকারোক্তির স্বেচ্ছামূলকতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের কথা বলেছে এবং দীর্ঘ পুলিশ হেফাজত, একই দিনে একাধিক স্বীকারোক্তি গ্রহণ ও নির্যাতনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একুশ বছর পর এই মামলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ নয়—বিচারের পদ্ধতি। এত প্রাণহানির একটি মামলায় সত্য যদি রাজনৈতিক পক্ষের সুবিধামতো রূপ বদলায়, তবে ইতিহাসের কাছে আমরা সবাই ঋণী হয়ে থাকি। কে দায়ী, কে নির্দোষ—তার চূড়ান্ত উত্তর আদালতই দেবে; কিন্তু আদালতের কাছে পৌঁছানো প্রমাণ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে সত্যও অন্ধকারে থেকে যায়। জনগনের প্রত্যাশা এমন একটি বিচারব্যবস্থা যেখানে কোনো সরকার তদন্তকে নিজের রাজনৈতিক অস্ত্র বানাতে পারবে না এবং কোনো অপরাধীও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে পার পেয়ে যেতে পারবে না।
এই প্রসঙ্গেই আজকের সম্পাদকীয় ভাবনাটি আরও বিস্তৃত হয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন দেখছি আমরা; কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে তখনই, যখন ব্যাংকের টাকা আমানতকারীর কাছে নিরাপদ থাকবে, নদীর পানি ন্যায্য থাকবে, মহাসড়ক আইনের অধীনে থাকবে এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা সত্যের কাছে জবাবদিহি করবে। অর্থনীতি আসলে শুধু জিডিপির অঙ্ক নয়—এটি মানুষের বিশ্বাসেরও অঙ্ক। বিশ্বাস ভেঙে গেলে ব্যাংক দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, রাষ্ট্রও দুর্বল হয়।
দূর পৃথিবীতেও আজ একই শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে—বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিও ঋণের ভার থেকে মুক্ত নয়। আর মধ্যপ্রাচ্যে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের নাজরান বিমানবন্দর ও আরামকো স্থাপনায় ড্রোন হামলার দাবি করেছে; এর ফলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পৃথিবীর বড় শক্তিরাও যখন ঋণ, যুদ্ধ ও নিরাপত্তার ভারে নুয়ে পড়ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য আত্মনির্ভরতা, সুশাসন ও স্থিতিশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো ভবিষ্যতের বীমা।
জুমার এই সকালে তাই প্রার্থনা হোক খুব সরল—আল্লাহ আমাদের আমানত রক্ষার শক্তি দিন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেন প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, অর্থ যেন লুটের সম্পদ না হয়, নদী যেন কূটনীতির বন্দী না হয়, প্রযুক্তি যেন মানুষের স্বাধীনতার শত্রু না হয় এবং বিচার যেন কোনো দলের মুখাপেক্ষী না হয়। মানুষ চলে যায়, সরকার বদলে যায়, ক্ষমতার মসনদও একদিন খালি হয়; থেকে যায় কেবল কাজের হিসাব। সেই হিসাবের দিনে যেন আমরা বলতে পারি—যে আমানত পেয়েছিলাম, অন্তত তা অন্যায়ভাবে নষ্ট করিনি।
