অনাবাসযোগ্য ঢাকার আর্তনাদ: দায় কার, মুক্তির পথ কোথায়?

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  শাহ্ মহিউদ্দীন:

"যে শহর যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি, সেই শহরই যদি মানুষের বসবাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠিন নগরীতে পরিণত হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই- সমস্যা কোথায়, দায় কার?"

একটি দেশের রাজধানী শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়; সেটি সেই দেশের উন্নয়ন, পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই রাজধানী যদি আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বিশ্বের অন্যতম অনাবাসযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর এবং আত্মসমালোচনার বিষয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো- ঢাকা কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর নয়, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধেরও শিকার নয়। তবুও বিশ্বের তৃতীয় অনাবাসযোগ্য শহরের তালিকায় উঠে এসেছে এর নাম। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, একটি শহরের বাসযোগ্যতা কী দিয়ে নির্ধারিত হয়। কেবল উঁচু দালান, উড়ালসেতু কিংবা মেট্রোরেল একটি শহরকে বাসযোগ্য করে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, পরিবেশের মান, দক্ষ গণপরিবহন, সংস্কৃতি, অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধার সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই একটি শহরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। এই সূচকগুলোতেই ঢাকা ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। গত কয়েক দশকে রাজধানীর জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সড়ক, গণপরিবহন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কিংবা নাগরিক সেবা সম্প্রসারিত হয়নি। উন্নয়নের নামে অনেক খাল ভরাট হয়েছে, জলাধার দখল হয়েছে, উন্মুক্ত স্থান হারিয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, আর গ্রীষ্মে কংক্রিটের শহর তাপদ্বীপে পরিণত হয়।

আরেকটি বড় সমস্যা বায়ুদূষণ। বছরের উল্লেখযোগ্য সময় ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর কাতারে অবস্থান করে। ইটভাটা, নির্মাণকাজ, যানবাহনের ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার নির্গমন প্রতিদিন লাখো মানুষের ফুসফুসে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে শব্দদূষণও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যানজট ঢাকার আরেকটি স্থায়ী দুর্ভোগ। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে নষ্ট করছেন। এতে শুধু ব্যক্তিগত সময়ই নয়, জাতীয় উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি অপচয়, মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। একটি আধুনিক রাজধানীর জন্য এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু এই সংকটের মূল কারণ আরও গভীরে। বাংলাদেশে উন্নয়ন এখনো অত্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক। উন্নত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, করপোরেট চাকরি, প্রশাসনিক দপ্তর এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসছেন। রাজধানীর ধারণক্ষমতা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে, অথচ সেই চাপ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আমরা উন্নয়নকে অনেক সময় দৃশ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। নতুন সেতু, উড়ালসেতু বা দৃষ্টিনন্দন ভবন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নাগরিকের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত পার্ক, নিরবচ্ছিন্ন পানি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহনও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।

সমাধান কী?

প্রথমত, রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোকে অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে হবে। মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল, শিল্পাঞ্চল এবং সরকারি দপ্তরের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা গেলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মেট্রোরেল, বিআরটি বাস এবং রেলপথকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে সহজ, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিত ব্যাটারী চালিত অটোরিকশার লাগাম টেনে ধরতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। খাল, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার করতে হবে। বায়ুদূষণের উৎসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণকাজে পরিবেশগত মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শহরে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, নগর পরিচালনায় জবাবদিহি ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। রাজধানীতে একাধিক সংস্থা কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবে ভোগান্তি বাড়ে। একটি রাস্তা নির্মাণের পরপরই অন্য সংস্থা সেটি খুঁড়ে ফেলে-এ ধরনের সমন্বয়হীনতা নাগরিক দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিকল্পিত ও সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, নাগরিক দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, অবৈধ দখলকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং গণপরিসরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ-এসবও একটি বাসযোগ্য শহর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মনে রাখতে হবে, বাসযোগ্য শহর গড়ে ওঠে এক দিনে নয়; আবার এক দিনের অবহেলায় ধ্বংসও হয় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল।

ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম অনাবাসযোগ্য শহরের তালিকা থেকে বের করে আনা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবতাকে স্বীকার করার সাহস, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন নাগরিক সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়ে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবেন, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে না, শিশুরা নিরাপদ পার্কে খেলতে পারবে এবং প্রবীণরা নিশ্চিন্তে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারবেন।

যুদ্ধ ছাড়াই যদি একটি রাজধানী মানুষের জন্য কষ্টের প্রতীক হয়ে ওঠে, তবে সেটি প্রকৃতির নয়, আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

 লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আমার বার্তা/শাহ্ মহিউদ্দীন/এমই