রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মির ভুমিকা

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২২ | অনলাইন সংস্করণ

  ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন:

বর্তমানে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমন্ত অঞ্চল সহ রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির (এ এ) নিয়ন্ত্রণে, তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চকপিউ ও সিতওয়ে বন্দর এখনো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে এবং তা রক্ষায় বিমান ও নৌ হামলা জোরদার করেছে। এই দুই বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো রাখাইন রাজ্য এ এ’র দখলে চলে আসবে। একটি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন রাখাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই এ এ’র দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। মিয়ানমারের সরকার এ এ’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করলেও রাখাইনে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ এ’র রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউ এল এ) বর্তমানে রাখাইনে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছে। তাদের নিজস্ব পুলিশ ও নিরাপত্তা কাঠামো, আদালত ও বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রয়েছে। এ এ’র রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভাব্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে ।

এ এ’র অধিকৃত অঞ্চল থেকে তাদের অত্যাচারের কারনে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে কিংবা মিয়ানমার ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এ এ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের বদলে আরো নিষ্ঠুর আচরণ করছে বলে জানা যায়। এ এ প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতার কথা বললেও রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের থেকে জানা যায় যে, এ এ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হাত দিয়েছে। তাঁরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা চালু করছে যা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থি। একই সাথে এ এ রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের চলাচলের ওপরও বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। রোহিঙ্গাদের জীবিকা অর্জনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় এবং চলাচলের ওপর বিধি নিষেধ আরোপ করার কারনে তাদের জীবন জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

রাখাইনে এ এ’র বিরুদ্ধে পুরো পরিবারকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, সম্মিলিত শাস্তি, যৌন সহিংসতা এবং বাড়িঘর এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এ এ রোহিঙ্গাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত,  জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং অবৈধ ও বৈষম্যমূলক কর আরোপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিচ্ছে। এ এ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের কারনে  রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারনে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়ছে এবং কতক বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউ এল এ যদি ন্যায়বিচার এবং বৈধতা চায় তবে তাদেরকে রাখাইনে বসবাসকারী সমস্ত জাতিগত গোষ্ঠীর সাথে সমান আচরণ এবং নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের জন্য এ এ মিয়ানমার জান্তা সরকার কে দায়ী করলেও  রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনে রাখাইন জনগোষ্ঠী ও এ এ’র সম্পৃক্ততা ছিল। এ এ’র মুখপাত্র জানায় যে, ভবিষ্যৎ রাখাইন রাষ্ট্রে সব জাতিগোষ্ঠীর নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিবে এবং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। অতীতের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার তারা তাদের নিজস্ব আদালতে করবে বলে জানায়। শুধু নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানও নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এ এ আন্তরিক হলে তাদেরকে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। তবে বাস্তবে এ এ’র কার্যকলাপে এই মানসিকতার প্রতিফলন  তেমন স্পষ্ট নয়। 

এ এ তাদের সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বিস্তৃত মাদক অর্থনীতির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করছে। এ এ’র বৈধ অর্থনৈতিক আয়ের উৎস না থাকায় রাখাইন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ইয়াবা ও আইস পাচার তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এই অর্থ দিয়েই সংগঠনটি অস্ত্র সংগ্রহ, খাদ্য ও রসদ সরবরাহ এবং স্থানীয় প্রশাসন, ট্যাক্স ব্যবস্থা ও বিচার কাঠামো পরিচালনাতে এই অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। নাফ নদী ও সাগর পথ দিয়ে ইয়াবা ও আইস চোরাচালান হচ্ছে যার প্রায় ৮০ ভাগ সাগর পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ এ এই মাদক পাচারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে জানা যায়।  সম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ও চোরাচালানের সাথে নানাভাবে জড়িত। প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ইয়াবা নাফ নদী, সাগরপথ এবং বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের আনুমানিক ৬৫টি পয়েন্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে মানব ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগ ও রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ, মাদক ও চোরাচালান  রোধে সীমান্তে কড়া পাহারা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।  বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মাদক উদ্ধার, পণ্য পাচার ও স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো এই এলাকায় প্রভাব বিস্তারের সাথে সম্পর্কিত। এ এ তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকেই এসব ঘটনার সৃষ্টি বলে জানা যায়। এ এ, আরসা ও আরএসওর মধ্যে ত্রিমুখী গোলাগুলি ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণে বান্দরবান সংলগ্ন বাংলাদেশ - মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায়  প্রায়শই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও চোরাচালান রুট দখলকে কেন্দ্র করেই এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শক্তিশালী চক্র বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চাপের মুখে রেখেছে। কোস্টগার্ড ও বিজিবি এসব এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।  তবে শুধুমাত্র  আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বৃদ্ধি করে মাদক-সন্ত্রাস মোকাবিলা সম্ভব হবে না। আঞ্চলিক সহযোগিতা, সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে এই মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সীমান্ত এলাকায় অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব বাড়ছে এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। 

বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায়ও এ এ’র আগ্রাসী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা মাইন বিস্ফোরণ, ক্ষুদ্রাস্ত্র হামলা এবং সীমান্ত অতিক্রম করে গুলিবর্ষণের ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি বিপদজনক হয়ে উঠছে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ এ’র আর্মির সহিংসতার কারনে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এ এ’র বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণ ও জলসীমা লঙ্ঘনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া এখন জেলেদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে,  নাফ নদে এ এ’র অনুপ্রবেশ ও জেলেদের অপহরণের ফলে হাজার হাজার জেলে পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাদের জীবিকা এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এবং স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ ও মৎস্যখাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে তৎপর হতে হবে। 
সংঘাতের কারনে রাখাইন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে খাদ্য ও অর্থসংকট মোকাবেলায় এ এ সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় রাখাইনে ভারতের মিজোরাম সীমান্ত হয়ে চাল, তেলসহ কিছু নিত্যপণ্য আসছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ এ নিয়ন্ত্রিত রাখাইনের  ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ থেকে স্থল ও নৌপথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মিয়ানমারে পাচার করছে। বিনিময়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তে পণ্য পাচার ও মাদক বিনিময় এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।  বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য চালু এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত সহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে এ এ বাংলাদেশের সাথে আলোচনায়  আগ্রহী বলে জানা যায়। রাখাইনে এ এ’র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি  বদলে যাবে এবং বাণিজ্য, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাস্তব অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা করা যায়।

চলমান প্রেক্ষাপটে এ এ’কে প্রথমে রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আরাকান আর্মিকে রাখাইন সম্প্রদায়ের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের যে অবিশ্বাস ও ভীতি রয়েছে তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের চলাচল, জীবিকা অর্জন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্যান্য মানবিক অধিকার নিশ্চিতে বিরাজমান বাধাগুলো দূর করতে হবে।  একই সাথে সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র পাচার বন্ধে এ এ’কে আরও তৎপর হতে এবং  বাংলাদেশের জলসীমা থেকে জেলেদের অপহরণ বন্ধ করতে হবে। এ এ বাংলাদেশের সাথে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বিষয়ে আলোচনা করে বাণিজ্য সহজ করার মাধ্যমে চোরাচালান বন্ধের ব্যবস্থা নিতে পারে। রাখাইনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পেলেও চলমান পরিস্থিতিতে এ এ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গা ও রাখাইন জনগুষ্ঠির মধ্যেকার ব্যবধান গুছিয়ে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যেকার বিভেদ দূর হলে সামনের দিনগুলোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সহজ হবে।


 লেখক: মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

আমার বার্তা/ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন/এমই