ইংরেজি মানেই কি আতঙ্ক নাকি সম্ভাবনা

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  মো. শাদনম শাহরিয়ার রূপম:

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ইংরেজি ভাষা। এটি কেবল একটি ভাষা নয়; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আজও এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষাটিকে ভয় ও আতঙ্কের চোখে দেখে।

প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় বারো বছর ইংরেজি পড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরও বহু শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে বা গুছিয়ে লিখতে পারেন না। প্রশ্ন জাগে—এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরও কেন এমন ব্যর্থতা? কেন ইংরেজি আমাদের কাছে দক্ষতা নয়, বরং এক ধরনের ভীতির নাম হয়ে উঠেছে?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু মৌলিক কাঠামোগত ও প্রায়োগিক দুর্বলতার দিকেই আঙুল উঠবে।

আমাদের দেশে ইংরেজি শেখানো মানেই মূলত গ্রামার শেখানো। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে ব্যাকরণকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। অথচ আমরা ভুলে যাই—ইংরেজি কোনো গণিতের সূত্র নয়, এটি একটি জীবন্ত ভাষা। আমরা যেমন মাতৃভাষা শিখেছি নিয়ম মুখস্থ করে নয়, বরং শুনে, দেখে ও ব্যবহার করে—ইংরেজির ক্ষেত্রেও হওয়া উচিত ছিল ঠিক তেমনটাই। কিন্তু বাস্তবে ভাষাকে রপ্ত করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য নিয়ম ও সংজ্ঞা, যা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহকে রুদ্ধ করে দেয়।

ইংরেজি শিক্ষায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবও একটি বড় অন্তরায়। শহরকেন্দ্রিক কিছু প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক ভালো প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও গ্রামাঞ্চলে সেই সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার মানে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।

ভাষা শেখার চারটি মৌলিক দক্ষতা—Listening (শোনা), Speaking (বলা), Reading (পড়া) এবং Writing (লেখা)। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় পুরো গুরুত্ব দেওয়া হয় কেবল Reading ও Writing-এর ওপর। Listening ও Speaking—এই দুইটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা কার্যত উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে না, তারা ইংরেজিতে কথা বলতে গিয়ে সংকোচ ও ভয়ে আক্রান্ত হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—শুরু থেকেই ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তব গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় না। ইংরেজিকে জীবনের একটি অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে নয়, বরং পরীক্ষায় পাশ করার একটি বিষয় হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়। ফলে ভাষাটির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ভয়ের, ভালোবাসার নয়।

উত্তরণের পথ: ভীতি নয়, সম্ভাবনাকে আলিঙ্গন

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।

প্রথমত, প্রাথমিক স্তর থেকেই ইংরেজি চর্চায় গুরুত্ব দিতে হবে। ভারত, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশ ছোটবেলা থেকেই ইংরেজিকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলেছে। আমাদেরও ইংরেজিকে শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, Listening ও Speaking দক্ষতায় বিশেষ জোর দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে প্রেজেন্টেশন, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক ও দলগত আলোচনা বাধ্যতামূলক করা গেলে শিক্ষার্থীদের জড়তা কাটবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

তৃতীয়ত, ইংরেজি শেখার পরিবেশকে আনন্দময় করতে হবে। গল্প, গান, সিনেমা কিংবা অভিনয়ের মাধ্যমে ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা গেলে ইংরেজি আর ভয়ের বিষয় থাকবে না, বরং উপভোগ্য হয়ে উঠবে।

চতুর্থত, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অডিও-ভিডিও উপকরণ, ভাষা শেখার অ্যাপ ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে চারটি দক্ষতাই সমানভাবে চর্চার সুযোগ তৈরি করা যায়।

সবশেষে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অনুশীলনে অভ্যস্ত করতে হবে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ইংরেজি সংবাদপত্র, প্রবন্ধ ও সাহিত্য পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডায়েরি লেখা বা ছোট রচনা লেখার চর্চা ভাষার ওপর দখল বাড়াতে সহায়ক হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ভাষা আতঙ্কের বিষয় নয়—ভাষা হলো যোগাযোগের সেতু। কাঠামোগত সংস্কার, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং সঠিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করা গেলে ইংরেজি আমাদের কাছে আর ভয়ের নাম থাকবে না। বরং এটি হয়ে উঠবে সম্ভাবনার এক শক্তিশালী হাতিয়ার, যা আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।


লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আমার বার্তা/মো. শাদনম শাহরিয়ার রূপম/এমই