ইসরাইল-ফিলিস্তিন স্থায়ী শান্তি রক্ষায় দ্বি-রাষ্ট্র নীতি
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ১৫:২৯ | অনলাইন সংস্করণ
অলোক আচার্য:

ফিলিস্তিনের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন বাড়লেও কার্যত ইসরাইলকে এখনো দমানো যায় নি। প্রতি ঘন্টায় সেখানে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ইসরাইলের ফিলিস্তিনে হামলার শত দিন পার হয়েছে। এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের নিহত সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথ খুঁজছে। যদিও তাতে অগ্রগতি কমই। তবে যেহেতু আবারও এই যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব দিয়েছে যদিও ইসরাইল তাতে অসম্মতি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরাইলের অন্যান্য মিত্র দেশ এবং বিপক্ষে থাকা রাষ্ট্রগুলোও ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের’ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে একটি ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ইসরাইলের পাশাপাশি অবস্থানের কথা উল্লেখ আছে। নেতানিয়াহুর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার পরপরই একই দিনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন, ‘এই অঞ্চলে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া গাজা পুনর্গঠনের স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করার কোনো উপায় নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ইসরাইলকে ‘দ্বি-রাষ্ট্র’ সমাধানে চাপ দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সোমবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে দুপক্ষের শীর্ষ কূটনীতিক এবং প্রধান আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে গাজা যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি চূড়ান্ত ‘দ্বি-রাষ্ট্র’ সমাধানের জন্য ইসরাইলকে চাপপ্রয়োগ করেছেন ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যেকার অমিমাংসিত বিষয় নিয়ে চলা যুদ্ধে প্রাণহানি,সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির তৈরি করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরীহ ফিলিস্তিনিরা এর নির্মম শিকার হচ্ছে। এই বিরতি সাময়িক নয়, পৃথিবী চায় স্থায়ী সমাধান। স্থায়ী সমাধান না হলে কখনোই এ অঞ্চলে শান্তি ফিরবে না। যুদ্ধ থেকে পৃথিবীকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। যুদ্ধ পৃথিবীকে কিছ্ইু দিতে পারে না কেবল ধ্বংস ছাড়া। শুরু থেকেই ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আত্নরক্ষার অধিকারের নামে যা হচ্ছে সেটি কেবল আত্নরক্ষার মধ্যেই সিমাবদ্ধ নেই, এটি এখন চরম অমানবতার পর্যায়ে গেছে।
মানবতা ফিলিস্তিনে ভূলুন্ঠিত হচ্ছে, শিশুদের জন্য জায়গাটা এখন নরকের থেকে বেশি ভয়াবহ। হামলার এই পর্যায়ে সব দেশই চাইছিল যুদ্ধ বিরতি। ফিলিস্তনে ইসরাইলের ব্যাপক অভিযানে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ ছাপিয়ে হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ এবং গাজা উপত্যকায় ঘটে চলা তীব্র নৃশংসতা বিশ্বের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দশক ধরেই বিশ্ব যেন যুদ্ধ বন্ধ করার চেয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পরাকেই নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েছে। মানুষ এতটাই অমানবিক, প্রতিশোধ পরায়ণ এবং নিষ্ঠুর হতে পেরেছে যে ফিলিস্তিনের একটি হাসপাতালেও বোমার আঘাতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানে কিন্তু মৃত মানুষও ছিল। একজন মানুষ আর কতবার মরবে? অতি দ্রুত এখন ইসরাইলের এই নৃশংসতা বন্ধ করা জরুরি এবং বিশ্বকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতি এবং রাজনৈতি পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধে দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্ব আবারো সামনে এসেছে। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান মূলত ফিলিস্তিনি ও ইসরাইল নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সহজ ভাষায়, আলাদা আলাদা দুটি সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ ইহুদি জনগণের জন্য ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ফিলিস্তিন। দুটি দেশের মানুষ একে-অপরের পাশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে সেটি সমাধানের জন্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকেই সবচেয়ে উত্তম মনে করছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ও ইসরাইল আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অনেক দেশ এতে সমর্থন জানায়। ইসরাইল ক্ষমতা দখলের পর থেকে গাজায় একের পর এক হামলা চালায়। দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের তত্ত্বটি এসেছিলো ১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি আলোচনার মাধ্যমে এবং দু'পক্ষই তাতে সম্মত হয়েছিল। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতির উৎস মূলত ক্যাম্প ডেভিড অ্যাকর্ডস চুক্তি (শান্তি চুক্তি)। ১৯৭৮ সালে মিসসর ও ইসরাইল এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। দুই পক্ষই জেরুজালেম শহরকে নিজেদের রাজধানী হিসাবে দাবি করে। দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজার উদ্দেশ্যেই একটি মডেল দাঁড় করানো হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এ তত্ত্ব বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিভিন্ন সময় এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। দ্বি-রাষ্ট্র নীতিতে এখনো সমাধান সম্ভব এটা বিশ্বাস করে বেশিরভাগ দেশ ও মানুষ। দুটো আলাদা দেশ হবে এবং আলাদা আলাদা স্বাধীন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এভাবে সমাধান সম্ভব। তাছাড়া যুদ্ধ চলতেই থাকবে। যদি উভয় পক্ষই এ চুক্তি বা দ্বি-রাষ্ট্র নীতি মেনে চলে তাহলে অমিমাংসিত বিষয়গুলো উভয়ের সম্মতিতে মিমাংসা করা সম্ভব হবে। তবে এটা মেনে চলার আপাতত খুব বেশি সম্ভাবনা নেই।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে এর উত্তর এ কারণে দেওয়া যায় না কারণ যে কারণগুলো দেখিয়ে সেসব বিষয়ে কিভাবে ঐক্যমতে পৌছানো সম্ভব হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। অথবা কোন দেশ নিজ উদ্যোগে এই কাজটি করবে সেটিও প্রশ্নের। ফলে যুদ্ধ থামার কোনা আশা দেখছে না বিশ^। যত দীর্ঘ সময় নিয়ে যুদ্ধ হবে ততই ক্ষতি বাড়বে। নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। মানুষ তার বেঁচে থাকার আশা হারাবে। নিজেকে একবার সেই জায়গায় ভাবি যেখানে যুদ্ধাবস্থায় মানুষের দিন রাত্রি চলছে। হয়তো একপক্ষ বিজয়ী হবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরে যাবে মানবতা অর্থাৎ মানুষ। যুদ্ধ এক আজব বিষয়। মানুষের প্রাণ নিয়ে মানুষের লাভ! লাভ-ক্ষতির হিসেবের পাল্লায় ক্ষতির হিসাবটাই অনেক বড়। একটি টেকসই পৃথিবী গঠনে অস্ত্র নয় প্রয়োজন সবার জন্য খাদ্য,শিক্ষা,চিকিৎসা,বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হতে প্রথমেই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আর তা না হলে নিজেদের হাতে তৈরি সভ্যতায় নিজেরাই বিলুপ্ত হবে কোনো সন্দেহ নেই।
ফিলিস্থিনিদের সাথে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে দ্বিরাষ্ট্র নীতি উল্লেখযোগ্য সমাধান হতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিন এত সহজে তাদের এই প্রস্তাব মানবে কি না সেটাই প্রশ্ন। ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিষয়ে বিশ্বকে একমত হতে হবে এবং তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এভাবে আর কত নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটবে যাদের বেশিরভাগই ফিলিস্তিনি? ইসরাইলের একের পর এক আক্রমণে ফিলিস্তিনের অনেক এলাকা আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। কতদিনে ঐ অঞ্চলে একটি স্থায়ী সমাধান আসবে সেটাও নিশ্চিত নয়। যুদ্ধ এবং শান্তি পরস্পর বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বর্তমান বিশ্বে দুটো বিষয়ই পাশাপাশি চলছে। একদিকে একে অন্যকে আক্রমণাত্বক বক্তব্য ছুড়ছে অন্যদিকে শান্তির বুলি। মানুষ আসলে কি চায় তা মনে হয় নিজেও জানে না। যাদের মাথার ওপর ছাদ ছিল। আজ নেই। মানুষের তৈরি অস্ত্র সেই ছাদ ধ্বংস করে দিয়েছে। পৃথিবীর মানুষকে আসলে গভীরভাবে ভাবতে হবে যে তারা কি চায়, যুদ্ধ না শান্তি? অস্ত্র না মানবতা? এসব তো পাশাপাশি চলতে পারে না। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে চলা যুদ্ধবিরতি অতীতেও কার্যকরের পর ফের উভয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। অতীতেও ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নিরসনে বিশ্বে দাবি জোরালো হয়েছে। পরিকল্পনা হয়েছে, প্রস্তাব হয়েছে কিন্তু বাস্তবে এর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুই একটি স্বাধীন ভূমির প্রত্যাশা করে। যুদ্ধ বা হানাহানি জন্ম থেকে প্রত্যাশা করে না। কিন্তু ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া একটি শিশু কেন সেই স্বপ্ন দেখতে পারবে না এর উত্তর কারও কাছে নেই। ফলে পৃথিবীর স্বার্থে পৌছাতে হবে কোনো স্থায়ী সমাধানে। এভাবে পক্ষ-বিপক্ষ একটি বিশ্বযুদ্ধে অথবা ব্যাপক যুদ্ধে রুপ নিতে পারে। এর মধ্যে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সুতরাং পৃথিবীর স্বার্থেই সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং মানবিক উপায়ে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা যুদ্ধ বিরতি চাই না, আমরা চাই স্থায়ী সমাধান অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধ হোক।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট, পাবনা।
আমার বার্তা/অলোক আচার/এমই
