বিশ্ব নৌ দিবস ২০২৬: নীতি বাস্তবায়নে নিরাপদ ও আধুনিক নৌ খাত গড়ার প্রত্যয়
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

‘নীতি থেকে বাস্তব প্রয়োগ নৌ খাতে উৎকর্ষতা অর্জন’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব নৌ দিবস ২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের সামুদ্রিক ও নৌ খাতকে আরও নিরাপদ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নৌপরিবহন অধিদপ্তর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, নাবিক, মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল খন্দকার মেসবাহ-উল-আজিম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নীতির সুফল বাস্তবে পৌঁছানোর তাগিদ
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, নৌ খাতের উন্নয়নে শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন অনুমোদন কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এসব নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ জাহাজ চলাচল, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নাবিক তৈরি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বন্দরের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্য খালাসে প্রয়োজনীয় সময় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সমন্বয়ের গুরুত্ব
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান সমুদ্রনিরাপত্তাকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয় আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ক্ষেত্রে মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস বা সমুদ্রাঞ্চল সম্পর্কে সমন্বিত তথ্যভিত্তিক ধারণা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও মাতারবাড়ী
অনুষ্ঠানে দেশের বন্দর অবকাঠামোর বর্তমান সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়েও আলোচনা হয়। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করছে।
ভবিষ্যতে আরও প্রায় ৪০ লাখ টিইইউ অতিরিক্ত কনটেইনার পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে। এ বাড়তি চাপ সামাল দিতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। ২০২৯ সালে বন্দরটির কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় আকারের মাদার ভেসেল সরাসরি গ্রহণের সক্ষমতা থাকায় এটি দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে আরও নিরাপদ ও আধুনিক করার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়। প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার নৌপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় নৌপথ এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সমন্বিত নৌযোগাযোগ দেশের পণ্য পরিবহন ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে কমপ্লায়েন্স
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বা শিপ রিসাইক্লিং খাতেও অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের ২৪টি ইয়ার্ড ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স অর্জন করেছে। আরও ২০টি ইয়ার্ডকে সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে এ খাতকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানানো হয়।
গ্রিন শিপিংয়ের দিকে গুরুত্ব
সামুদ্রিক খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টিও এবারের বিশ্ব নৌ দিবসের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রিনভয়েজ-২০৫০ কর্মসূচির সহায়তায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
নৌপরিবহন খাতকে ভবিষ্যতে আরও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে জ্বালানি দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি এবং টেকসই নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
দক্ষ নাবিক তৈরিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
দেশের সামুদ্রিক খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়। বর্তমানে দেশে ১৫টি মেরিটাইম একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করছে।
নারীদের মেরিটাইম পেশায় অংশগ্রহণের বিষয়েও অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০১৪ সাল থেকে দেশের মেরিটাইম একাডেমিগুলো থেকে ১৩৮ জনের বেশি নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
বিশ্ব নৌ দিবসের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের নৌ ও সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, দক্ষ জনবল, বন্দর সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মান-সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতকে আরও সক্ষম করে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই শেষ হয় বিশ্ব নৌ দিবস ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক আয়োজন।
