গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্টগার্ডের পরিচয়ে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ওই যুবকের কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। একে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে গুমের প্রথম ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
নিখোঁজ ওই যুবকের নাম মিরাজ শেখ (৩০)। তার বাড়ি মোংলার জয়মণি গ্রামে। এইচআরডব্লিউ অবিলম্বে তাকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি গুম রোধে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম অভিযোগ করেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্থানীয়দের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামীকে আটকে রাখা হয়েছে।
মুক্তা খানম বলেন, খবর পেয়ে আমি কোস্টগার্ডের পন্টুনে গিয়ে দেখি তাকে আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে কোস্টগার্ডের পোশাকে আট থেকে ১০ জন এবং সাদাপোশাকে আরও ছয়-সাতজন উপস্থিত ছিলেন। মিরাজকে কালো কাঁচের একটি ঘরে ঢোকানো হয়। প্রায় ৩০ মিনিট পর একটি স্পিডবোট এসে তাকে কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যায়।
পরে এক ইউপি সদস্যের মাধ্যমে নম্বর জোগাড় করে হাড়বাড়িয়া কোস্টগার্ড ফাঁড়িতে ফোন করেন মুক্তা। তিনি বলেন, ‘ফোন ধরে একজন জানান যে মিরাজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে। কিন্তু পরদিন সকালে মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড অফিসে গেলে ডিউটিতে থাকা নতুন দল জানায়, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না।’
মিরাজের বোন লিজা ইসলামের ভাষ্য, তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় কোস্টগার্ড সদস্যরা তার ভাইয়ের মোটরসাইকেলটি আল আমিন নামের এক ব্যক্তির চায়ের দোকানে রেখে যান। পরে আল আমিনও নিশ্চিত করেন যে তার দোকানে মোটরসাইকেলটি রাখা হয়েছিল এবং পরে কোস্টগার্ডের লোকেরাই সেটি নিয়ে যান।
এ ঘটনায় গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন মুক্তা খানম। পরে গত ৮ মে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে স্বামীর সন্ধান দাবি করেন তিনি।
তবে কোস্টগার্ডের মোংলা পশ্চিম জোনের অপারেশনস অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল আরেফিন মিরাজকে আটকের অভিযোগ তখন অস্বীকার করেন।
এইচআরডব্লিউ জানায়, মিরাজের সন্ধানের দাবিতে তার বাবার করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে ওই জেলেকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতের আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এখনকার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সত্যিকারের সংস্কার ছাড়া এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এই ধরনের চর্চা গেঁথে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা।’
বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও স্বাধীন তদন্তের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেটি বাতিল করে নতুন একটি আইন প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হবে এবং গুমের তদন্তভার পুলিশের হাতেই থাকবে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং গুমের ঘটনা তদন্তে তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশের ওপর গুমের তদন্তভার ছেড়ে দিলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এ ধরনের চর্চা বন্ধে প্রয়োজনীয় চাপও তৈরি হবে না।’
আমার বার্তা/এমই
