বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনা ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১০:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে চীনের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় আগ্রহী।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাইয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক ও অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী চীন সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে সহযোগিতার জন্য সিসিপিআইটি দলের প্রতি এবং ব্যস্ততার মধ্যেও সেমিনারে অংশ নেওয়ার জন্য চেয়ারম্যান রেন হংবিনকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক কয়েক দশকের আস্থাভিত্তিক বন্ধুত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছেন। পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও বাস্তবধর্মী সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কূটনীতি থেকে উন্নয়ন, উন্নয়ন থেকে বাণিজ্য এবং এখন শিল্পখাতসহ বিস্তৃত অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে যেসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো দূর করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এখন অর্থনীতি ও সুশাসনে একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের উন্নয়নের যাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন দ্রুত উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদন, আধুনিক অবকাঠামো ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ কারণে চীনের উৎপাদন ব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্য খুঁজবে। বাংলাদেশ সেই গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল সম্প্রসারণের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে তারা যেমন বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, তেমনি দেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধাও নিতে পারবে। এটি হবে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক ও বাস্তবভিত্তিক অংশীদারত্ব।
তিনি জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ১৮০ দিনের একটি কঠোর কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাজের পুনরাবৃত্তি হ্রাস এবং সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও সেবার গতি বাড়বে।
তারেক রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বৈষম্যহীন সুবিধা পাবেন। দেশের আইন অনুযায়ী মূলধন ও লভ্যাংশ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং তাদের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পভিত্তিক অবতরণ কেন্দ্র বা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যান্ডিং ফান্ড’ গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব এলাকায় বন্দরসংযোগ, পরিবহন সুবিধা, ইউটিলিটি সেবা, শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করা হবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এতে আরও সুস্পষ্ট সুরক্ষা ও আধুনিক বিনিয়োগ কাঠামো যুক্ত হবে।
বিডায় ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক চালু করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যেখানে খাতভিত্তিক বিনিয়োগ সুযোগ, প্রণোদনা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজে তথ্য পাওয়া যাবে।
এ সময় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে বলেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ অফিস চালু করা হবে। এর লক্ষ্য হলো, চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসার আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। এতে আগ্রহ থেকে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ হবে।
তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকার আরও কাজ করছে। নতুন লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এর ফলে নতুন কোনো ব্যবসা ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্প খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ, নিরাপদ এবং স্বচ্ছ করা। তবে তিনি স্বীকার করেন, সবকিছু এখনো নিখুঁত নয়। নতুন সরকার হিসেবে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে তারা অবগত এবং সেগুলোর সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী বৃহৎ অর্থনৈতিক বিস্ময়ের সহ-নির্মাতা হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সফলভাবে কাজ করছে। তারা বাংলাদেশের মানুষের দক্ষতা, প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সম্ভাবনার কথা জানে। তারা এটাও বলতে পারবে যে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম।
শেষে তিনি আরও বেশি সংখ্যক চীনা কোম্পানিকে বাংলাদেশ সফর করে নতুন দৃষ্টিতে দেশটিকে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার বিনিয়োগকারীদের প্রতি অটল অঙ্গীকারবদ্ধ। তাদের বিনিয়োগের মূল্যায়ন করা হবে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা শোনা হবে এবং একটি আরও কার্যকর বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সমৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন। সমতার ভিত্তিতে প্রকৃত অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধ হই।’
আমার বার্তা /জেএইচ
