আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়মিত অস্ত্র লাইসেন্স
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:৪২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অন্তত আট হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে । এসব লাইসেন্সের অধিকাংশই পেয়েছেন আওয়ামী লীগের ( বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ) বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা - কর্মী এবং তাঁদের স্বজনেরা । ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত দেওয়া এসব লাইসেন্সের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানলেও এত দিন প্রকাশ্যে আসেনি ।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে । জেলায় জেলায় তদন্ত কমিটি কাজ করছে । মন্ত্রণালয় বলছে , যাচাই - বাছাই শেষে অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল , অস্ত্র জব্দ এবং মামলা করা হবে । জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন , শুধু অনাপত্তিপত্রের বিষয় নয় , আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে । সেগুলো যাচাই - বাছাই করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায় , আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে শটগান বা এনপিবি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালা ও পুলিশের বিশেষ শাখার ( এসবি ) অনুমোদনের পর জেলা প্রশাসক ( ডিসি ) লাইসেন্স দিতেপারেন । কিন্তু পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাই - বাছাই শেষে জেলা প্রশাসক আবেদনকারীকে যোগ্য মনে করলে সুপারিশসহ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয় । মন্ত্রণালয় অনাপত্তি দিলে জেলা প্রশাসক লাইসেন্স ইস্যু করেন । কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দেওয়া অন্তত ৮ হাজার ১৭৩ টি পিস্তল ও রিভলবারের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের এই অনাপত্তি নেওয়া হয়নি । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও পাঠানো হয়নি । জেলাগুলোর সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের হিসাব মেলানোর সময় এই নিয়ম লঙ্ঘন ধরা পড়ে । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন , মূলত এসব লাইসেন্স নামমাত্র কাগজপত্র এবং রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে ।
বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানলেও এত দিন কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে কিছু বলেননি । ওই সময় একটি জেলায় ডিসি থাকা এক কর্মকর্তা বলেন , তিনি যে জেলায় দায়িত্বে ছিলেন , সেখানে এমনটা খুব একটা হয়নি । তবে বিষয়টি তাঁরা সবাই জানেন । সবকিছু দলীয়ভাবে পরিচালিত হলে এমন হওয়াই স্বাভাবিক । অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ থাকায় এবং আবেদনকারী মন্ত্রীদের স্বজন হওয়ায় আবেদনগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি । আর পাঠালেও তা অনুমোদন হয়েই আসত , তাই কেউ গুরুত্ব দেননি । পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী , সারাদেশে ব্যক্তি , প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৩ হাজার ৭০২ টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে । এর মধ্যে ব্যক্তির নামে রয়েছে ৪৮ হাজার ২৮৩ টি , আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮৫৪ টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫ টি । রাজনীতিকদের নামে লাইসেন্স রয়েছে ১৪ হাজার ২৩৫ টি , এগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা- কর্মীর কাছে ১১ হাজারের বেশি লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে । শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে ( ২০০৯-২০২৪ ) সারা দেশে মোট ১৯ হাজার ৫৯৪ টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় । এগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ১৭৩ টি পিস্তল ও রিভলবারের লাইসেন্স দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি ছাড়া ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে , স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া পিস্তল বা রিভলবারের লাইসেন্সধারীদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ -৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা । তাঁদের কাছে লাইসেন্স করা অন্তত আটটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে । খুলনায় রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগের নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ ( গল্লামারী ) , সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস , জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজগর বিশ্বাস , মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জেড এ মাহমুদ ডন , সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম , টাঙ্গাইলের সাবেক এমপি তানভীর হাসান ছোট মনির ও তাঁর ভাই গোলাম কিবরিয়া বড় মনির , সাবেক এমপি ছানোয়ার হোসেন , সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহান জয় , সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানা , জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুজ্জামান সোহেল এবং টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি । বগুড়ায় আওয়ামী লীগের ১৩৪ জন নেতা - কর্মীর লাইসেন্স করা পিস্তল রয়েছে । তাঁদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মজনু , যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন , আসাদুর রহমান দুলু এবং পৌর আওয়ামী লীগের নেতা রফিনেওয়াজ খান রবিন উল্লেখযোগ্য । ওই আমলে মুন্সিগঞ্জে ১৮৪ টি ,কিশোরগঞ্জে ২০০ টি , রংপুরে ৪০৮ টি এবং নাটোরে ৩৫০ টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান , বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি ছাড়াই দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই - বাছাই শুরু হয়েছে । অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিল , অস্ত্র জব্দ ও মামলা করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন । তাঁর নির্দেশের পর ইতিমধ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের সব লাইসেন্স পর্যালোচনায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে । লাইসেন্সগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় বা নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছিল কি না , তা খতিয়ে দেখা হবে । প্রতিটি জেলার ডিসি , পুলিশ সুপার , অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট , এনএসআইয়ের প্রতিনিধি এবং পাবলিক প্রসিকিউটরকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো . দেলোয়ার হোসেন বলেন , বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া লাইসেন্সের বিষয়ে জেলায় জেলায় তদন্ত কমিটি কাজ করছে । সম্ভাব্য অনিয়ম চিহ্নিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে । প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
আমার বার্তা /জেএইচ
