যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার এত অস্থির ছিল কেন: আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার এত অস্থির ছিল কেন—এ প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) এই যে চুক্তিগুলো এভাবে করল, বাংলাদেশকে হাত–পা বাঁধা অবস্থায় ফেলল। ইচ্ছা করলেই বলতে পারত, নির্বাচিত সরকার আসছে, আপনারা নির্বাচিত সরকারের সাথে কথা বলতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) উৎসাহ, সেই বাজেটের সময় থেকে তাদের উৎসাহ অতিমাত্রায় বেশি ছিল।’

‘দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচ’।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থায় কী পরিবর্তন হলো—এ প্রশ্ন তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘চুক্তিগুলো করার ব্যাপারে তাদের (অন্তর্বর্তী সরকার) বিশেষ উৎসাহ দেখে মনে হয়েছে, তারা উপদেষ্টা কিংবা বিশেষ সহকারী হলেও, আসলে তারা বিভিন্ন কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।’

নতুন সরকারের প্রতি বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

বিএনপির সরকারের প্রতি আনু মুহাম্মদের আহ্বান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ—তারেক রহমানের এই স্লোগান যদি সত্যি হয়, তারেক রহমান যদি এটা সিরিয়াসলি মিন করে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো, এই চুক্তিগুলো থেকে বাংলাদেশ কীভাবে মুক্তি পাবে, তার রাস্তা পরিষ্কার করা। এই চুক্তিগুলো যাঁরা সম্পাদন করেছেন, তাঁদের জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনা।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যেসব দেশ করেছে, তাদের চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।’

চুক্তির শর্তের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘সরকার দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত–সুবিধা পাবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখানে এত শর্ত আর অনিশ্চয়তা রয়েছে যে বাস্তবে কোনো সুবিধা মিলবে কি না, সেটা স্পষ্ট নয়। তুলার দাম বেশি হবে। রপ্তানির পরিমাণও নির্দিষ্ট করা নেই।’

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ইউনূসের আগ্রহটা কী কারণে ছিল… তিনি তো তাঁর নিজের যা যা করার গ্রামীণ নামের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান করেছেন। ট্যাক্স মওকুফ করেছেন। তাঁর যা যা করার, সুবিধাগুলো তো হয়েছে…নাকি জাতিসংঘ মহাসচিব হওয়ার জন্য তাঁকে কোথাও এই সমস্ত কাজ করতে হবে, তাঁর এমন কথা দেওয়া আছে?’

চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি

আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।’ তাঁর মতে, চুক্তিতে এমন কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।

চুক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কৃষি–শিল্প খাতে ভর্তুকি সীমিত করার শর্ত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পকে দাঁড় করাতে ভর্তুকি প্রয়োজন।’ চুক্তি বাতিল অথবা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে আলোচনা করা আর জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।

অসম চুক্তির উদাহরণ

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর আইনি ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। আলোচনায় তিনি বলেন, ‘এসব চুক্তির ধারাগুলো আনফেয়ার কন্ট্রাক্ট টার্মসের (অসম চুক্তি) উদাহরণ। এসব চুক্তি নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি।’

চুক্তিগুলো শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও আইনগতভাবেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—মন্তব্য করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার মাধ্যমে এগুলো পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবি।

নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচের কো-অর্ডিনেটর বরকত উল্লাহ মারুফ। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষক মাহা মির্জা।


আমার বার্তা/এমই