বৈশ্বিক আবহাওয়ায় যেভাবে বড় পরিবর্তন আনছে ‘এল নিনো’
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বিশ্বের আবহাওয়া বদলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ‘এল নিনো’ গত কয়েক মাস ধরে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এটি এরইমধ্যে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপ ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে। চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সংগতি রেখে ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ দাবানল, নজিরবিহীন বন্যা ও অতি তীব্র তাণ্ডব চালানো ঘূর্ণিঝড়।
ওয়ার্ল্ড মেট্রলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রেকর্ড ভাঙা এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং এটি অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনো কী
‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যায়, যা বৈশ্বিক আবহাওয়াকে ওলটপালট করে দেয়। এর প্রভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চরম খরা ও দাবানল দেখা দেয়, অন্যদিকে আমেরিকা অঞ্চলে সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন বন্যা ও অতি শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়।
এল নিনো আবহাওয়া পরিবর্তনের অনুঘটক
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া অতিরিক্ত শুষ্ক ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি দাবানলের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা গ্রেটার লন্ডনের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ। এল নিনোর কারণে দেশটিতে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণ ভূখণ্ড দাবানলের আগুনে পুড়েছে।
দাবানলের কারণে ইন্দোনেশিয়ার স্কুলগুলো বন্ধ করতে হয়েছে এবং হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সুমাত্রা ও কালিমন্থানের লাখ লাখ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়াশার মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি শিশু কাশি, ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর ব্যাধিতে ভুগছে।
এদিকে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতি কমে গেছে। এটি ঝড়গুলোকে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছে।
চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২২টি ঝড় ও ১২টি হ্যারিকেন তৈরি হয়েছে, যার ১০টিই ছিল খুবই শক্তিশালী। মৌসুম শেষ হতে এখনও দুই মাস বাকি থাকলেও, গড়ে যতগুলো হ্যারিকেন তৈরি হয় সেই রেকর্ড ইতোমধ্যেই পার হয়ে গেছে।
সম্প্রতি হ্যারিকেন পলো এল নিনোর সৃষ্ট উষ্ণ পানির প্রভাবে দ্রুত রূপ বদলে ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া তৈরি করে। পলো ছাড়াও একই সময়ে একই অঞ্চলে ‘ওদালিস’ এবং ‘নোলো’ নামে আরও দুটি হ্যারিকেন অবস্থান করছিল। এক মাসের ব্যবধানে গত সেপ্টেম্বর মাসেই দুইবার একই সঙ্গে তিনটি করে হ্যারিকেন তৈরি হতে দেখা গেছে। ২০১৫ সালের পর একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে এমন তিনটি হ্যারিকেনের উপস্থিতি আর দেখা যায়নি।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ‘মেসাক’ এবং ‘দুজিয়ান’-এর মতো বেশ কিছু শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পূর্ব চীন ও জাপানে বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা-ভূমিধস দেখা দিয়েছে।
জাপান মেট্রলজিক্যাল এজেন্সি তথ্যমতে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এ বছর ১০টি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, যা ১৯৬৬ সালের পর এক মৌসুমে সর্বোচ্চ।
সাধারণত এল নিনোর সময়ে প্রশান্ত মহাসাগর উত্তপ্ত থাকায় ঘূর্ণিঝড়গুলো স্থলভাগ থেকে কিছুটা দূরে (পূর্ব দিকে) তৈরি হয়। এর ফলে সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় গরম পানি থেকে শক্তি নিয়ে ঝড়গুলো আরও শক্তিশালী হয় এবং উপকূলে পৌঁছানোর আগেই বিধ্বংসী টাইফুনে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই বছরের বাকি সময়ে আরও টাইফুন তৈরি হতে পারে, যা চীন ও জাপানে নতুন করে দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরে। উত্তর আটলান্টিকে এল নিনোর প্রবল বাতাসের কারণে ঝড়গুলো তৈরি হতে বাধা পাচ্ছে। ফলে এই মৌসুমে সেখানে কেবল একটি মাত্র হ্যারিকেন ‘ইসায়াস’ গঠিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও অ্যালাবামায় আঘাত হানে। কৃত্রিম উপগ্রহের যুগ (ষাটের দশক) শুরুর পর থেকে এটিই সবচেয়ে দেরিতে গঠিত হওয়া হ্যারিকেনের রেকর্ড। অথচ, অন্যান্য বছর এই সময়ে গড়ে অন্তত ১০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়, ৫টি হ্যারিকেন এবং ২টি প্রধান হ্যারিকেন তৈরি হয়। এ বছর এখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৮টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় দেখা গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ভারতেও এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়া শুষ্ক ও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজের জন্য অতি প্রয়োজনীয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে।
ভারতে বৃষ্টিপাতের এই ঘাটতি স্বাভাবিক মনে হলেও অঞ্চলভিত্তিক তারতম্য ছিল আশঙ্কাজনক। মধ্য ভারতে স্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়ে ‘ব্যতিক্রমী খরা’ দেখা দিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত কমেছে ২৪ শতাংশ। যেখানে বৃষ্টি হয়েছে, সেখানে দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর হঠাৎ অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটেছে। এটি ভারতের কৃষিপণ্যের উৎপাদনে চরম ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
