বন্যা ও খরায় বিশ্বে খাদ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

শনিবার বান্দরবানে ভারী বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে আবাসিক এলাকায়।

ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি চলতি বছর বিশ্বজুড়ে খাদ্য পণ্যের সরবরাহ ও দামে দ্বিতীয় ধাক্কা দিতে পারে ‘সুপার’ এল নিনো। এর প্রভাব ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। মূল্যস্ফীতির এই নতুন আশঙ্কা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকেও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। ফলে সুদের হার উচ্চ স্তরে বজায় রাখার উদ্বেগ বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওসেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোর চক্রটি বিশ্বজুড়ে বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়িয়ে ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে এটিকে ‘সুপার’ বা ‘গডজিলা’ এল নিনো বলা হচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকরা লিখেছেন, এল নিনো ইতোমধ্যে ফসলের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।  ভারতে বর্ষা মৌসুম শুষ্ক হয়ে উঠেছে। কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশটির মধ্যাঞ্চলের কিছু অংশে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৫০ শতাংশ। যা গম, চাল ও আখের সরবরাহকে ব্যাহত করতে পারে।

গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতে, খাদ্যপণ্যের দাম ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর একটি পরোক্ষ প্রভাব বিশ্বজুড়েই পড়বে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যয়ের এই সম্পর্ক দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে। চূড়ান্ত পরিস্থিতি প্রকাশ পেতে পারে ২০২৮ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। 

খুচরা বাজারে দামের প্রতিফলন কীভাবে ঘটবে, তা মূলত বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নির্ভর করে। এছাড়া ভোক্তাদের চাহিদা ও খুচরা বিক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণের মতো বিষয়গুলোও এখানে ভূমিকা রাখে। ইতালীয় ব্যাংক ইউনিক্রেডিট-এর মতে, ‘সুপার’ এল নিনোর কারণে বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। এটি প্রায় ৩৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষতির সমান।

ব্যাংকটি জানিয়েছে, প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ফসল, যেমন- চাল, পাম অয়েল, চিনি ও কফির দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংবা বা তারও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি মূলত ‘ক্লাইমেটফ্লেশন’ বা জলবায়ুজনিত মূল্যস্ফীতিকে আবারও সামনে নিয়ে আসছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক ইউবিএস-এর বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এল নিনো সব অঞ্চলের কৃষির ওপর একইভাবে প্রভাব ফেলে না। এটি বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনকে বদলে দেয়। ফলে আঞ্চলিকভাবে কেউ লাভবান হয়, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপেক্ষাকৃত উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে কিছু অঞ্চল সুবিধাজনক অবস্থানেও থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খরা পাম অয়েলের সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি প্রক্রিয়াজাত খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এছাড়া, অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া বিভিন্ন রোগবালাইয়ের বিস্তারকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যা আগামী বছরগুলোতে ফলন কমিয়ে দেবে।

অতীত উদাহরণ থেকে দেখা গেছে, এল নিনো বারবারই ফসল উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগের ভয়াবহ এক এল নিনোর কারণে চীন, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল, ব্রাজিল, মিসর ও ভারতে খরা দেখা দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় রূপ নেওয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কেবল ভারতে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়।

ইতিহাসে ১৯৮১-৮২, ১৯৯৬-৯৭, ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো চক্রগুলোও অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



আমার বার্তা/এমই