কেন ব্যর্থ হলো ইসলামাবাদ সংলাপ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কে কী চায়

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার একটি রুদ্ধশ্বাস কূটনৈতিক ম্যারাথন এবং নিবিড় আলোচনার পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই সমাপ্ত হলো ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ইসলামাবাদ বৈঠক। তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের ‘অযৌক্তিক ও উচ্চাভিলাষী’ দাবিকে দায়ী করা হলেও, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই ব্যর্থতাকে ইরানের জন্য এক ‘বড় ধরনের দুঃসংবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কোনো ‘কমন ফ্রেমওয়ার্ক’ বা সাধারণ রূপরেখা তৈরিতে দুই পক্ষ ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিক আলী বাঘেরি। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মূলত পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে চলমান দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতেই এই নিবিড় আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল।

কেন ভেস্তে গেল আলোচনা?

ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজের তথ্য এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অত্যন্ত কঠোর ছিল। তেহরান তাদের জনগণের মৌলিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি হয়নি।

১. ওয়াশিংটনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ কৌশল:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল এমন কিছু শর্ত আরোপ করতে চেয়েছিল যা ইরানকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করে ফেলত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে ইরানের প্রভাব খর্ব করা।

পরমাণু জ্বালানি অপসারণ: ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পরমাণু উপকরণ সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া।

২. ইরানের প্রতিরোধ ও অনমনীয়তা:

ইরানি প্রতিনিধি দল মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আড়ালে এমন কিছু লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছিল যা তারা গত কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হুমকির মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। স্পিকার গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা কোনো বিদেশি নির্দেশ মানতে বাধ্য নন। চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ ইসলামাবাদ আলোচনা, ফিরে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধিদলচুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ ইসলামাবাদ আলোচনা, ফিরে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধিদল

মার্কিন অবস্থান

সমঝোতা না হওয়ায় কোনো চুক্তি ছাড়াই ‘এয়ার ফোর্স টু’-তে করে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রস্থানের প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইরানের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, ‘খারাপ খবর হলো, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে দেখছেন। এর অর্থ হতে পারে, সামনের দিনগুলোতে ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক চাপ আসতে চলেছে।

পরিণাম ও ভবিষ্যতের গতিপথ

ইসলামাবাদ বৈঠকের এই ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করছে:

আস্থার সংকট: দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও কোনো সাধারণ বিন্দুতে পৌঁছাতে না পারা দুই দেশের মধ্যে গভীর আস্থার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে। ইরানও এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তারা বলেছে, প্রতিপক্ষের প্রতি আস্থা ও সদিচ্ছা যদি না থাকে তাহলে কোনো আলোচনাই ফল দেবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা: হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য: ইরান যদি আরও চাপের মুখে পড়ে, তবে তারা চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে, যা ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এরই মধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য জানিয়েছে, চীন শিগগিরই ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। যদিও যুদ্ধকালে বেইজিং ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তেহরানকে সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক ম্যারাথন কোনো সমাধান দিতে পারেনি। বরং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে আরও অনড় হয়েছে। ইরান বিভিন্ন ‘ইনিশিয়েটিভ’ বা উদ্যোগের কথা বললেও মার্কিন ‘লোভ’ ও ‘অযৌক্তিকতা’র কাছে তা হার মেনেছে বলে তেহরানের দাবি। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এখন তাদের পরবর্তী কৌশলের দিকে তাকিয়ে আছে। আপাতত কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই দুই দেশের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদ ত্যাগ করায় বিশ্ব এখন পরবর্তী উত্তেজনার অপেক্ষায় রয়েছে।