
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচনা করতে ফিফার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন দলের একদল সংসদ সদস্য (এমপি)। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা ও অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর ‘স্পষ্ট প্রমাণ’ না পাওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছেন তারা।
এই দাবি এসেছে চলতি মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনার পর। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দেশের প্রতি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সেটিও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এমপিরা।
আগামী আড়াই বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক- দুটি বড় ক্রীড়া আসরেরই আয়োজক। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য কী ধরনের প্রশ্ন তৈরি করছে, এবং তারা আদৌ কোনো অবস্থান নেবে কি না, সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
‘আড়াল করা ও প্রকাশ্য হুমকি’
গত ডিসেম্বরে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘পিস প্রাইজ’ দেয়। ফিফার ভাষ্য ছিল, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা এবং অন্যান্য সংঘাত নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার জন্যই এই স্বীকৃতি।
তবে এরপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়ায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড, সহ-আয়োজক দেশ মেক্সিকো এবং বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধেও সম্ভাব্য অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন।
এই পরিস্থিতিতে লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লাইড কামরুর ২৩ জন এমপি সংসদে একটি প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে বিশ্বকাপসহ বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকে ‘স্বাভাবিক বা বৈধ’ করে তুলতে ক্রীড়া আসর ব্যবহার করা উচিত নয়। এমপিরা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে ‘একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ডেনমার্ক, কলম্বিয়া ও কিউবার প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন হুমকি’ আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?
হোয়াইট হাউস এখনো এমপিদের এই প্রস্তাব নিয়ে বিবিসিকে কোনো মন্তব্য দেয়নি। তবে আগেই তারা দাবি করেছে, মাদুরোকে আটক করা ছিল একটি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরো একজন অবৈধ নেতা, যিনি মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে মাদুরো নিজেকে যুদ্ধবন্দি দাবি করেছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, অভিযানের সময় আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানা হয়নি, এ নিয়ে তিনি ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।
এদিকে ট্রাম্প কিউবাকে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ে ‘সময় থাকতে সমঝোতা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কলম্বিয়ার বিষয়ে তিনি বলেছেন, সেখানে সামরিক অভিযান ‘ভালো ধারণা’ হতে পারে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ‘বাস্তব হুমকি’ এখন রয়েছে।
মেক্সিকো নিয়েও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মেক্সিকোর মাটিতে কোনো মার্কিন সামরিক অভিযান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ ছাড়া ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ডকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দখলের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন ট্রাম্প, এমনকি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি।
ফিফা কি পদক্ষেপ নেবে?
এমপিদের প্রস্তাব নিয়ে ফিফা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শান্তি পুরস্কার নিয়েও তাদের অবস্থান বদলানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। তবে বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচের আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে ফিফা ব্যবস্থা নেবে, এমন সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে।
এর আগেও বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ফিফা। ২০১৮ সালে ক্রিমিয়া দখল, সাইবার হামলা ও স্যালিসবারিতে নভিচক হামলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ায় বিশ্বকাপ আয়োজন হয়েছিল। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
এই প্রসঙ্গে এমপি ব্রায়ান লেইশম্যান বলেন, “আমি মাদুরোর সমালোচক, এটা পরিষ্কার। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় যা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। রাশিয়ার ক্ষেত্রে যেমন কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে, এখানেও ধারাবাহিকতা চাই।” ফিফার ভেতরে কেউ কেউ বলেন, রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নৈতিক অবস্থান থেকে আসেনি; বরং নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অন্য দেশগুলোর খেলতে অস্বীকৃতির ফলেই তা কার্যকর হয়েছিল।
গত অক্টোবরে ফিফার অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো নিজেই। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিষেধাজ্ঞার দাবিতে চাপ বাড়লেও তিনি বলেছিলেন, “ফিফা ভূরাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারে না।”
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

