আধুনিক আকুপাংচার চিকিৎসা শশী হাসপাতালে
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৯ | অনলাইন সংস্করণ
হাফিজ রহমান

দীর্ঘদিনের কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, পিএলআইডি, আইবিএস, ঘুমের সমস্যা, ইরেক্টাইল ডিসফাংশন কিংবা স্ট্রোক-পরবর্তী শারীরিক জটিলতার মতো বিভিন্ন সমস্যায় দেশে-বিদেশে অসংখ্য মানুষ ভুগছেন। অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথা বা অস্বস্তি এতটাই তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী যে দৈনন্দিন কাজ, কর্মজীবন এবং স্বাভাবিক চলাফেরায়ও প্রভাব পড়ে।
এসব সমস্যায় অনেক রোগী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ, ইনজেকশন বা অস্ত্রোপচারের বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তবে অনেকেই এসবের বিকল্প চিকিৎসা খুঁজে থাকেন। এমন বাস্তবতায় দেশে আধুনিক আকুপাংচার চিকিৎসার প্রতি মানুষের আগ্রহও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের বাত, ব্যথা,প্যারালাইসিস সহ স্নায়বিক ও হরমোন জনিত সমস্যা ও প্রভৃতি রোগের শশী হাসপাতাল আধুনিক আকুপাংচার চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। এখানে, রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের ধরন এবং প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
আকুপাংচার আসলে কী?
চীনের প্রায় পাচ হাজার বছরের পুরোনো চিকিৎসা পদ্ধতি হলো আকুপাংচার। এটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জীবাণুমুক্ত সূঁচ ব্যবহার করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা হয়।
প্রচলিত চীনা চিকিৎসাবিদ্যার মতে, মানবদেহে Qi (চি) নামে পরিচিত একটি জীবনীশক্তি Meridians (মেরিডিয়ান) নামক শক্তিপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই শক্তির প্রবাহে ভারসাম্যহীনতা বা বাধা সৃষ্টি হলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আকুপাংচার এই শক্তিপথের নির্দিষ্ট বিন্দুতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে Qi-এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভারসাম্য পুনঃস্থাপন করে।
অন্যদিকে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, আকুপাংচার স্নায়ু, পেশি ও টিস্যুকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক রাসায়নিক, যেমন- এন্ডোরফিনের নিঃসরণ বৃদ্ধি করে, রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার উপসর্গ উপশম করে।
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি
বর্তমানে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধুনিক আকুপাংচার চিকিৎসা প্রচলিত রয়েছে। এটি একটি গবেষণাভিত্তিক পরিপূরক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৭৯ সাল থেকে আকুপাংচার নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন শুরু করে এবং পরবর্তী গবেষণা ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১০০টিরও বেশি রোগ ও শারীরিক অবস্থা এর জন্য আকুপাংচার চিকিৎসাকে সুপারিশ করেছে।
বিজ্ঞানসম্মত ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা পদ্ধতি হওয়ার কারণে আজ বিশ্বজুড়ে রোগীরা আকুপাংচারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমাতে চিকিৎসকরাও এখন আকুপাংচার চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
আকুপাংচার কীভাবে কাজ করে?
• স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে: সূক্ষ্ম সূঁচের উদ্দীপনা শরীরের স্নায়ুকে সক্রিয় করে এবং শরীরের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
• ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে: মস্তিষ্কে পৌঁছানো ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, ফলে ব্যথা ও অস্বস্তি কমে।
• প্রাকৃতিক ব্যথানাশক উপাদান বাড়াতে সহায়তা করে: শরীরে এন্ডোরফিনসহ প্রাকৃতিক রাসায়নিকের নিঃসরণ বাড়াতে সাহায্য করে, যা ব্যথা কমাতে ভূমিকা রাখে।
• রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে সহায়তা করে: আক্রান্ত স্থানে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে টিস্যুর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
• পেশির টান ও শক্তভাব কমাতে সাহায্য করে: পেশির ব্যথা, টান ও অস্বস্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
• শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতা সক্রিয় করে: শরীরের প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে।
কেন বাড়ছে মানুষের আগ্রহ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক আকুপাংচার সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর সহায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথাজনিত সমস্যায় ভুগছেন এমন অনেক রোগী—যারা ওষুধ, ইনজেকশন, অপারেশন কিংবা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না, তারা এখন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে আধুনিক আকুপাংচার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
শশী হাসপাতালে আধুনিক আকুপাংচার চিকিৎসা
২০১৯ সালে আকুপাংচার ও ঐতিহ্যবাহী চাইনিজ চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে শশী হাসপাতাল। দীর্ঘদিনের ব্যথা, স্নায়বিক সমস্যা এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগা রোগীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে একটি নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
শশী হাসপাতালের চীফ কনসালটেন্ট পাইওনিয়ার আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ ডা. এস. এম. শহীদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি রোগীর উপসর্গ, রোগের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগীর শরীরের নির্দিষ্ট আকু-পয়েন্টে আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জীবাণুমুক্ত নিডল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ব্যবহৃত নিডলগুলো FDA অনুমোদিত এবং প্রতিটি নিডল একবার ব্যবহারের পর আর ব্যবহার করা হয় না। পাশাপাশি, ইলেক্ট্রিক আকুপাংচার পদ্ধতিতে এসব নিডলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেওয়া হয়, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্নায়ু ও মাংসপেশির কার্যক্রমে উদ্দীপনা তৈরি করে।
শশী হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী আকুপাংচারের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি, ওজোন থেরাপি, কাপিং থেরাপি, চাইনিজ ফুট ট্রিটমেন্টসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রদান করা হয়। এছাড়া রোগীকে যত্ন, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রোগীর জন্য নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।ব্যথা ব্যবস্থাপনা, স্নায়বিক সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় রোগীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে শশী হাসপাতাল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শেষ কথা
দীর্ঘদিনের কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, সায়াটিকা, ফ্রোজেন শোল্ডার কিংবা স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতার মতো সমস্যাকে অবহেলা করা উচিত নয়। একইভাবে শুধুমাত্র অন্যের অভিজ্ঞতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য দেখে চিকিৎসা নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, দীর্ঘদিনের ব্যথা বা স্নায়বিক সমস্যায় ভুগলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনার মাধ্যমেই উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচন করা সম্ভব।
