
ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, মানবতা ও আনন্দের এক মহিমান্বিত উৎসব। এই সময়ে কোরবানীর পশুর মাংস পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তবে আনন্দের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতন থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অতিরিক্ত মাংস খেয়ে হজমের সমস্যা, গ্যাস, ওজন বৃদ্ধি কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকিতে পড়েন। তাই কোরবানীর মাংস কেন খাবেন, কতটুকু খাবেন এবং এর স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।
কোরবানীর মাংস বিশেষ করে গরু ও খাসির মাংস উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। প্রোটিন শরীরের পেশি গঠন, ক্ষয়পূরণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শরীরের কোষ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী এবং শারীরিক পরিশ্রম করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য পরিমিত পরিমাণ মাংস অত্যন্ত উপকারী।
এছাড়াও লাল মাংসে রয়েছে আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-১২ এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান। আয়রন রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং শরীরে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি-১২ স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখতে ও রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। জিঙ্ক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।
তবে উপকারিতা পেতে হলে অবশ্যই মাংস পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম রান্না করা মাংস যথেষ্ট। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত অংশ না খেয়ে চর্বি কম এমন অংশ বেছে নেওয়া ভালো। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাংস খাওয়া উচিত।
খাওয়ার সময় কিছু স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলা জরুরি। টাটকা মাংস সঙ্গে সঙ্গে রান্না না করে কিছু সময় ফ্রিজে রেখে রান্না করলে মাংস নরম ও সহজপাচ্য হয়। অতিরিক্ত তেল-মসলা ব্যবহার না করে সেদ্ধ, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা স্বাস্থ্যকর। পাশাপাশি প্রচুর শাকসবজি, সালাদ ও পানি খেলে হজম ভালো হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমে।
কোরবানীর সময় অনেকেই একসাথে অতিরিক্ত মাংস খেয়ে ফেলেন, যা শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি ও চর্বি জমায়। ফলে ওজন বৃদ্ধি, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, কোরবানীর মাংস শুধু আনন্দের খাবার নয়, এটি শরীরের জন্য পুষ্টিকরও বটে। তবে সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে মাংস খেতে হবে। সচেতন খাদ্যাভ্যাসই পারে ঈদের আনন্দকে আরও সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে।
লেখকঃ
ডা. এম. ইয়াছিন আলী
জনস্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক
চেয়ারম্যান
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল
মোবাঃ ০১৭৮৭১০৬৭০২
ইমেইল: [email protected]

