জেন্ডায়ার হাজার বছর পুরনো ইরানি কানের দুল ঘিরে তোলপাড়

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৮:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মার্কিন অভিনেত্রী জেনডায়া। ছবি: সংগৃহীত

হলিউড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’-এর বিশ্বব্যাপী প্রচারের অংশ হিসেবে লন্ডনে আয়োজিত এক ফটোকলে বিতর্কের মুখে পড়েছেন মার্কিন অভিনেত্রী জেনডায়া। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের একটি প্রাচীন ইরানি অলংকার কানের দুল হিসেবে পরে উপস্থিত হয়ে এই বিতর্ক উসকে দিয়েছেন তিনি।

শিল্প ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মূল্যবান এবং সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যকে হলিউডের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্রচারে ব্যবহৃত ফ্যাশন অনুষঙ্গ বানানোর কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এটি ইরানের প্রাচীন সংস্কৃতির অবদানকে ‘ছিনতাই ও অবমূল্যায়ন’ করার নামান্তর।

দ্য ওডিসি চলচ্চিত্রে গ্রিক দেবী অ্যাথিনার চরিত্রে অভিনয় করছেন জেনডায়া।

জেনডায়ার পরিহিত এই কানের দুল দুটি লন্ডনের মেফেয়ারভিত্তিক প্রত্নসামগ্রীর গ্যালারি ‘ব্যারন লন্ডন’ থেকে সংগৃহীত। গ্যালারিটির ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, তারা সংগ্রাহক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনে কাজ করে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন শিল্পকর্ম কেনাবেচা করে থাকে।

ব্যারন লন্ডনের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে গ্যালারিটি লন্ডনের অন্য এক জুয়েলারি ব্যবসায়ী গ্লেন স্পিরোর কাছ থেকে এই অলংকার দুটি সংগ্রহ করে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রত্নবস্তু দুটি খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের ‘জিভিয়ে ধনভান্ডার’-এর অংশ। ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে উত্তর-পশ্চিম ইরানে মেষপালকদের হাতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জের তৈরি এই ঐতিহাসিক রত্নভান্ডার আবিষ্কৃত হলেও পরবর্তী সময়ে তা লুট হয়ে যায়।

২০১৫ সালের এক গবেষণা নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে প্রাচীন এই ধনভান্ডারের অবশিষ্টাংশ ইরানের বাইরের এন্টিক বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের কাছে এসব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

ইরানি বংশোদ্ভূত শিল্প ইতিহাসবিদ এবং কোর্টঅল্ড ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সুসান বাবেই জেনডায়ার এমন পোশাকপরিচ্ছদ নির্বাচন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কাউকে সুন্দর, ক্ষমতাবান বা সিনেমার মহৎ আদর্শের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাইলিস্টদের মধ্যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান বা সংবেদনশীলতার কতটা ঘাটতি রয়েছে—এ ঘটনা তারই প্রমাণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো শুধু ফ্যাশন অনুষঙ্গ নয়; এসব বস্তুর গভীর আত্মিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি পুরো মানবজাতির ঐতিহ্য। অথচ এভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রাচীন ইরানের সাংস্কৃতিক অবদানকে চ্যাপ্টা ও অর্থহীন করে ফেলা হয়েছে।’

একই প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও প্রকাশক ড. অ্যানলিস বেয়ার বলেন, ‘এখানে প্রধান নৈতিক সংকট হলো কানের দুল দুটি তৈরি করা হয়েছে লুণ্ঠিত প্রত্নবস্তু থেকে। জেনডায়া এটি একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের রেড কার্পেটে পরায় বিষয়টি বড় আকারে জনসমক্ষে চলে এসেছে।’

তবে বিতর্ক প্রত্যাখ্যান করে ব্যারন লন্ডন দাবি করেছে, তারা আইনগত সব নীতি ও নথিপত্র মেনে দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই অলংকারগুলোর পরিচর্যা করছে। গ্যালারিটির মতে, বাণিজ্যিকভাবে নয়, বরং প্রাচীন পারস্যের স্বর্ণকারদের অতুলনীয় শিল্পকর্ম উদ্‌যাপন করতেই এই অলংকার প্রদর্শন করা হয়েছিল।

পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান ও তারকাদের ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর অনৈতিক ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্কের তালিকায় যুক্ত হলো এই ঘটনা।

এর আগে ২০২২ সালে বিখ্যাত মেট গালায় মেরিলিন মনরোর ঐতিহাসিক পোশাক পরিধান করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কিম কার্দাশিয়ান। এ ছাড়া আফ্রিকার লুণ্ঠিত ‘বেনিন ব্রোঞ্জ’, ইথিওপিয়ার পবিত্র ট্যাবলেট এবং গ্রিসের ‘পার্থেনন মার্বেল’ নিজেদের সংগ্রহে রাখা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত হয়ে আসছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম।

অন্যদিকে, নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ ছবিটিকে ঘিরে কেবল কানের দুল নয়, আরও একটি আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মরক্কোর দখলে থাকা বিতর্কিত পশ্চিম সাহারার ‘দাখলা’ শহরে চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ করায় সাহরাবি চলচ্চিত্র নির্মাতারা সিনেমাটি বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। দখলকৃত ভূখণ্ডকে চলচ্চিত্রের সেটিং হিসেবে ব্যবহার করাকে তারা সাহরাবি জনগণের অধিকারের প্রতি প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।


আমার বার্তা/এমই