দিলজিতের এই ছবি নিয়ে ভারত কেন তোলপাড়?
‘খালিস্তান’ আন্দোলনের অজানা অধ্যায়
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৬:২৮ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

জনপ্রিয় ভারতীয় গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জের নতুন সিনেমা ‘সতলুজ’ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে শুরু করে সিনেমাপ্রমীদের মাঝে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জিফাইভ -এ মুক্তির মাত্র দুই দিনের মাথায় সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ভারতের অন্যতম মানবাধিকার কর্মী জাসওয়ান্ত সিং খালরার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই সিনেমা।
নব্বইয়ের দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময়কার এক রক্তাক্ত অধ্যায়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে ‘সতলুজ’-এর কাহিনী। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্রের দাবিতে শিখ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। সে সময় বহু মানুষকে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মানবাধিকার কর্মী জাসওয়ান্ত সিং খালরা অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন, কীভাবে বহু ভুক্তভোগীর লাশ তাদের পরিবারের অজান্তে এবং কোনো সরকারি রেকর্ড ছাড়াই গোপনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। শুধুমাত্র অমৃতসরের তিনটি শ্মশান ঘেঁটে তিনি ২০৯৭টি এমন গোপন সৎকারের প্রমাণ পান। তার দাবি ছিল, গোটা পঞ্জাবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে এভাবে গুম করা হয়েছে। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও এই অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছিল।
এই সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে ১৯৯৫ সালে তিনি নিজেও নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে জানা যায়, তাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে পাঞ্জাব পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও দোষী সাব্যস্ত হন। এই বাস্তব ও স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘সতলুজ’।
২০২২ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সিনেমাটি ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের (সিবিএফসি) আপত্তির কারণে প্রেক্ষাগৃহে আলোর মুখ দেখেনি। ছবিটির প্রথম নাম রাখা হয়েছিল ‘ঘাল্লুঘারা’, যা শিখ ইতিহাসের ১৭৪৬ ও ১৭৬২ সালের গণহত্যামূলক কালো অধ্যায়কে নির্দেশ করে। সেন্সর বোর্ডের আপত্তির পর নাম বদলে রাখা হয় ‘পাঞ্জাব ৯৫’। কিন্তু ছবির পরিচালক হানি ত্রেহানের মতে, দিন দিন সেন্সর বোর্ডের আপত্তির তালিকা বাড়তেই থাকে।
পরিচালক জানান, প্রথমে ২১টি কাটের কথা বলা হলেও পরে ১২৭টি পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়। বাস্তব জীবনের যেকোনো রেফারেন্স, জাসওয়ান্ত সিং খালরার নাম এবং পুলিশের সহিংসতার দৃশ্য বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এমনকি ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকেও সিনেমাটি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন নির্মাতারা।
শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই থেকে পিছিয়ে এসে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহের আশা ছেড়ে সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘সতলুজ’ নামে সেন্সরবিহীনভাবে মুক্তি দেয়। ভারতের বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আইন অনুযায়ী, ওটিটির জন্য সেন্সর বোর্ডের অনুমতি বাধ্যতামূলক না হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এটি নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আরএসভিপি মুভিজের বরাতে জানা গেছে।
মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছিল ছবিটি। প্রখ্যাত ‘হলিউড রিপোর্টার’ একে বছরের অন্যতম সেরা ভারতীয় সিনেমা হিসেবে আখ্যা দেয়। তবে ভারতে এটি ব্লক করে দেওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে এক লাইভ ভিডিওতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘আমার ভালোবাসা এবং সম্মান জানবেন। আমি যা আগে থেকেই আশঙ্কা করেছিলাম, ঠিক সেটাই ঘটেছে। আমি ভেবেছিলাম সোমবার যখন সরকারি অফিসগুলো খুলবে, তখন হয়তো সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হবে। কিন্তু এটা যে এতো তাড়াতাড়ি, রবিবারের সন্ধ্যার মধ্যেই ঘটে যাবে, তা আমি জানতাম না।’
দিলজিৎ আরও জানান, এই অনিশ্চয়তার কারণেই তারা সিনেমাটির প্রচারণায় নামেননি। তার ভাষায়, ‘আমরা যদি সিনেমাটির প্রচার করতাম, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই কোনোদিন মুক্তি পেত না।’ তবে এতো বাধার পরও দর্শকেরা যে অন্তত দুই দিন সিনেমাটি দেখতে পেরেছেন, তাতেই তিনি খুশি।
অন্যদিকে সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন পরিচালক হানি ত্রেহান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে পুরোপুরি দিশেহারা। এই ঘটনার পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাব, তা আমার জানা নেই।’
জিফাইভ কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘চলতি ঘটনাবলি’র প্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে সিনেমাটি দেখা যাবে না। তবে তারা সিনেমার সৃজনশীল ভাবনার পাশে আছেন এবং দ্রুতই এটি ফিরিয়ে আনার আশা রাখছেন। আপাতত ভারতে সিনেমাটির আনুষ্ঠানিক প্রদর্শন বন্ধ থাকলেও বিশ্বজুড়ে এই রাজনৈতিক থ্রিলারটি নিয়ে আলোচনা থামছে না।
আমার বার্তা/এমই
