রূপালী ব্যাংকের কমেছে খেলাপি ঋণ, আমানত-রেমিট্যান্স অর্জনে রেকর্ড
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

দেশের ব্যাংকিং খাত যখন বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট আর খেলাপি ঋণের চাপে অস্থির সময় পার করছে, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক চলেছে উল্টো পথে। কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যাংকটি অর্জন করেছে নজরকাড়া সাফল্য। ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ আদায় থেকে শুরু করে আমানত সংগ্রহ ও রেমিট্যান্স; সব কটি সূচকেই ব্যাংকটি নিজেদের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এর ফলে ২০২৫ সালে রূপালী ব্যাংক খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নগদ আদায় করেছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ৩৬১ কোটি টাকা নগদ আদায়ের পাশাপাশি সমন্বয়ের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি, যা এর ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি ও স্বচ্ছতা আনতে মামলা ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রধান কার্যালয় থেকে তদারকির ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা আগের বছরের ৫৭১টির তুলনায় অনেক বেশি। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।
উদ্যোগগুলোর ফলে শ্রেণিকৃত ঋণের চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শ্রেণিকৃত ঋণ ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায়। শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ শতাংশে নেমেছে। সেই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে প্রভিশন ঘাটতিও।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বছরের শুরুতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার অক্টোবরে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকায় উঠেছিল। কিন্তু দক্ষ নেতৃত্ব ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে বছর শেষে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী ও এসএমই খাতে ঋণ সম্প্রসারণে ব্যাংকটি সফল হয়েছে। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন করে ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রূপালী ক্যাশ’ চালু করেছে তারা। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চিফ ইনফরমেশন টেকনোলজি অফিসার।
আমানত সংগ্রহেও এসেছে বড় সাফল্য। ২০২৫ সালে নতুন করে ৮ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পর্ষদের পরামর্শে ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নতুন আমানত সংগ্রহ এবং প্রায় ৪ লাখ নতুন হিসাব খোলা হয়েছে।
রেমিট্যান্স আহরণেও ব্যাংকটি রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স এসেছে। রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সাফল্য নয়; বরং ব্যাংককে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নই আমাদের অগ্রযাত্রার ভিত্তি। খেলাপি ঋণ আদায়ের এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের ফলে রূপালী ব্যাংক আবারও আস্থার প্রতীক হিসেবে উঠে আসছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকটি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের একটি অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হবে।
আমার বার্তা/জেইচ
