অনলাইন জুয়ার ‘গডফাদার’ গ্রেপ্তার, প্রতিদিন ৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

রাজধানীর গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার চক্রটির হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত অবৈধ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেন করতেন। পুরো চক্রটি বিদেশ থেকে চীনের নাগরিক নাতান নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে জানিয়েছে ডিবি।

ডিবির তথ্যমতে, বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। এর বড় একটি অংশ বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে ডিবি।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘অনলাইন জুয়া বিরোধী অভিযানে ৬ হাজার ৫০০টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিম কার্ড জব্দসহ আসামি গ্রেপ্তার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম।

গ্রেপ্তাররা হলেন-মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।

সংবাদ সম্মেলনে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর ও কুমিল্লায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি এমএফএস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিম কার্ড, বিভিন্ন কোম্পানির ৬৭টি সিম কার্ড, একটি ল্যাপটপ, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।

তিনি বলেন, ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে পরিচালিত বেশ কয়েকটি জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনায় এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে এসব অ্যাকাউন্টের তথ্য পর্যালোচনা করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা হয়।

তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে গাজীপুরের টঙ্গীর একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা ডিবির সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের এলিট প্যালেস হোটেলে অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমএফএস অ্যাকাউন্টের তথ্য সংরক্ষণের জন্য তারা বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করত এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করত।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ পরিচালনায় Pay Kashma, Gopay, Lucky Pay, LQ Pay, XE Pay এবং Cool Pay-এর মতো একাধিক পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে অনলাইনে এমএফএস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তুলনায় সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ থাকায় তারা বেশি ব্যবহার করে এমএফএস অ্যাকাউন্ট।

তিনি বলেন, জুয়ার সাইট পরিচালনায় সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। দিন শেষে এসব অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া অর্থ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। পরে Binance, Bybit ও Bitget-এর মতো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইউএসডিটি (USDT) কিনে বিদেশে থাকা পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেটে পাঠানো হয়।

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার চক্রটির ডিভাইস বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, তারা প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। চক্রটির হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত এর আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। অবৈধ আয়ে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। সম্প্রতি পূর্বাচলে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তিনি আবারও একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনেছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে চক্রটি নানা কৌশল অবলম্বন করত বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, যেখান থেকে আরিফুল ইসলাম রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেখানে তিনি একসঙ্গে তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি যে কক্ষে থাকতেন, সেটির দৈনিক ভাড়া ছিল ৫০ হাজার টাকা। কয়েক দিন পরপর অবস্থান পরিবর্তন করে কখনো অন্য হোটেলে, আবার কখনো কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলে উঠতেন, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে সহজে শনাক্ত করতে না পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক নাতান নামে এক চীনা নাগরিক।

দেশ থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার অনলাইন জুয়ার লেনদেন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আমার বার্তা/এমই