নোয়াখালীতে দুই হাজারেরও বেশি হিজড়া, নিবন্ধিত ভোটার মাত্র ১৪ জন

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য ভোটার তালিকায় আলাদা ক্যাটাগরি থাকলেও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলায় এখনো একজন হিজড়ার নামও ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৫ সংসদীয় আসনের আওতাভুক্ত এই তিন উপজেলায় বসবাসরত হিজড়া জনগোষ্ঠী তাই কার্যত তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছে।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালীর ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪৮ জন এবং নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৭৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন মাত্র ১৪ জন।

এই ১৪ জনের মধ্যে নোয়াখালী-১ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-২ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ৮ জন, নোয়াখালী-৪ আসনে ৩ জন, নোয়াখালী-৫ আসনে কোনো হিজড়া ভোটার নেই এবং নোয়াখালী-৬ আসনে রয়েছেন ২ জন। অথচ জেলার ৯টি উপজেলায় দুই হাজারেরও বেশি হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার নিবন্ধন ফরম (ফরম-২) সংশোধনের মাধ্যমে হিজড়াদের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি চালু করার পাশাপাশি স্বেচ্ছায় পুরুষ বা নারী হিসেবেও নিবন্ধনের সুযোগ রেখেছে। বাড়ি বাড়ি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও রয়েছে। তবে বাস্তবে নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত তিন উপজেলায় এর কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে ওই এলাকাগুলোতে হিজড়া ভোটারের সংখ্যা শূন্যই রয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও ভোটার তালিকায় তৃতীয় লিঙ্গের আলাদা ক্যাটাগরি সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কখনো জানানো হয়নি, কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তাও তারা পাননি।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, পরিচয়পত্র সংক্রান্ত জটিলতা, বাবা-মায়ের কাগজপত্রের অভাব এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক অবহেলার কারণে তারা এখনো ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি। এর ফলে তারা শুধু ভোটাধিকার থেকেই নয়, বরং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার লাকী হিজড়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় এখনো একজনও হিজড়া ভোটার তালিকাভুক্ত নেই। অথচ এসব এলাকায় দুই শতাধিক হিজড়া বসবাস করছেন। অনেকেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের সঙ্গে থাকলেও তাদের বাবা-মায়ের কোনো কাগজপত্র নেই। ভোটার নিবন্ধনের জন্য যেসব কাগজ চাওয়া হয়, সেগুলো আমাদের অনেকের কাছেই নেই। ফলে চাইলেও আমরা মূলধারায় আসতে পারছি না।

হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরু মা আলো হিজড়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করা মানে আমাদের আরও পিছিয়ে দেওয়া। সহজ ও মানবিক প্রক্রিয়ায় ভোটার নিবন্ধন, সমন্বিত উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর জরুরি।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি প্রায় এক বছর ধরে এই এলাকায় দায়িত্ব পালন করছি। এ সময়ে কোনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ভোটার হতে আসেননি। আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলাকালে মাঠ পর্যায়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কেউ ভোটার হতে এলে নির্বাচন অফিস সব সময় আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবে।

নোয়াখালীর সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষকে ভোটার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি হিজড়া পল্লীতে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়লেও রাষ্ট্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

তিনি আরও বলেন, ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে হিজড়া সম্প্রদায়ের কেউ যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার না হন, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে। ভোটকেন্দ্রে তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে এবং সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


আমার বার্তা/জেএইচ